সেরিব্রাল পালসি হচ্ছে স্নায়বিক রোগের একটি গ্রুপ। জন্মের আগে বা জীবনের প্রথম দিকে মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বিকাশ বা ক্ষতির ফলে পক্ষাঘাত দ্বারা এই রোগ সৃষ্টি হয়।
ধরণঃ
চার ধরণের সেরিব্রাল পালসি রয়েছে। এগুলো হচ্ছে-
১. স্পাস্টিক,
২. এথেটয়েড,
৩. অ্যাটাক্সিক এবং
৪. মিশ্র সেরিব্রাল পালসি।
♦ স্পাস্টিক সেরিব্রাল পালসির ক্ষেত্রে নড়াচড়ার ক্ষেত্রে তীব্র পক্ষাঘাত দেখা যায়। শরীরের একপাশের হাত-পায়ে হেমিপ্লেজিয়া অর্থাৎ স্পাস্টিক সংকোচন দেখতে পাওয়া যায়। স্পাস্টিক ডিপ্লেজিয়াতে স্পাস্টিক সংকোচন এবং পক্ষাঘাত সাধারণত রোগীর বাহু এবং হাতের তুলনায় নীচের অঙ্গে বেশি আক্রান্ত করে থাকে। অথবা এক্ষেত্রে শুধুমাত্র রোগীর পা আক্রান্ত হতে পারে। যা প্যারাপ্লেজিয়া নামে পরিচিত।
স্পাস্টিক সেরিব্রাল পালসির কারণে প্রাথমিকভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি করে থাকে। এটি সেরিব্রাল কর্টেক্সের নিউরন এবং সংযোগগুলোকে প্রভাবিত করে। হয় সেরিব্রাল একটি গোলার্ধের (প্যারালাইসিসের বিপরীরে) যা চাইল্ড হেমিপ্লেজিয়ায় অথবা উভয় গোলার্ধে অর্থাৎ ডিপ্লেজিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
♦ এথেটয়েড ধরণের সেরিব্রাল পালসির ক্ষেত্রে রোগীর স্বেচ্ছায় নড়াচড়ায় পক্ষাঘাত নাও হতে পারে। এবং এক্ষেত্রে স্পাস্টিক সংকোচন সামান্য পরিমাণে হতে পারে বা স্পাস্টিক সংকোচন একেবারে নাও হতে পারে। এর পরিবর্তে মুখ, ঘাড় এবং হাত-পায়ের যেকোনো একপাশ অসাড় বা ধীর হওয়ার পাশাপাশি হেমিয়াথেটোসিস বা অনিচ্ছাকৃত খিঁচুনি দেখা দেয়।
অথবা আরও ঘনঘন উভয় পাশে (ডাবল এথেটোসিস) হতে পারে। যার ফলে পুরো শরীর বা বিভিন্ন অংশে অনিচ্ছাকৃত নড়াচড়া, মুখ ঝাঁকুনি এবং ডাইসার্থ্রিয়া বা অস্পষ্ট কথার সমস্যা দেখা দেয়। এই সবই চাপ বা উভয় উত্তেজনার সময় বৃদ্ধি পায়। এর ফলে মস্তিষ্কের ক্ষতি বিশেষ করে সেরিব্রাল কর্টেক্সের নিচের বেসাল গ্যাংলিয়া প্রভাবিত হয়।
♦ অ্যাটাক্সিক সেরিবাল পালসি হচ্ছে বিরল ধরণের একটি রোগ, যার বৈশিষ্ট হচ্ছে দুর্বল সমন্বয়, পেশী দুর্বলতা, অস্থির হাঁটাচলা এবং দ্রুত বা সূক্ষ্ণ নড়াচড়া করতে অসুবিধা সৃষ্টি করা।
♦ যদি একজন রোগীর মাঝে দুই বা ততোধিক ধরণের সেরিব্রাল পালসির লক্ষণ প্রকাশ পায়, তাহলে তাকে বলা হয় মিশ্র সেরিব্রাল পালসি। মিশ্র সেরিব্রাল পালসির ক্ষেত্রে বেশিরভাগ রোগীর মাঝে স্পাস্টিক এবং এথেটয়েট এই দুই ধরণের লক্ষণ দেখা যায়।
প্রভাবঃ
সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত অনেক শিশু মানসিকভাবে সক্ষম। তবে, প্রাথমিক জীবনে যেকোনো মস্তিষ্কের রোগের ফলে বৌদ্ধিক এবং মানসিক বিকাশে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। কখনো কখনো এই ব্যাঘাত তীব্র আকার ধারণ করতে সক্ষম। মস্তিষ্কের পক্ষাঘাতে আক্রান্ত অনেক শিশুর ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যাদের শরীরের যে সকল অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়, সেই সকল স্থানে খিঁচুনির আক্রমণ দেখা যায়।
বিশেষ করে স্পাস্টিক ধরনের মস্তিষ্কের আক্রমণে বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা এবং মৃগীর আক্রমণ ঘনঘন ঘটতে দেখা যায়। আর অ্যাথেটয়েড ধরনের ক্ষেত্রে খিঁচুনি এবং বৌদ্ধিক অক্ষমতার মত বিষয় খুবই বিরল। অ্যাথেটয়েড সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুরা বুদ্ধিমান এবং বোধগম্য হতে পারে। তবে অনিচ্ছাকৃত নড়াচড়া এবং ডিসার্থরিয়ার কারণে আক্রান্ত শিশুরা প্রায়শই বোধগম্য শব্দ বা ইঙ্গিতের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে অক্ষম হয়। অর্থাৎ তারা ইশারায় কথা বলতে বা বুঝতে সক্ষম হয় না।
কারণঃ
একাধিক কারণে সেরিব্রাল পালসি হতে পারে। তবে বেসাল গ্যাংলিয়া এবং সেরিব্রাল কর্টেক্সের জটিল নিউরোনাল সার্কিটের ত্রুটির সাথে এই রোগ জড়িত। এই রোগের সাথে বংশীয় বা বংশগত কারণ খুব কম ভূমিকা পালন করে। এই রোগ নিউরন, ইন্টারস্টিশিয়াল টিস্যু বা মস্তিষ্কের রক্তনালীগুলোর ত্রুটির মাধ্যমে নিজের প্রকাশ এবং বিকাশ ঘটাতে পারে।
আবার এই রোগটি মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক রসায়নের মাধ্যমেও নিজের প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম। এসব ছাড়াও এই রোগের আরও সাধারণ কারণ হচ্ছে ভ্রুণের রোগ এবং মস্তিষ্কের ভ্রুণের ত্রুটি। গর্ভাবস্থায় মা এবং ভ্রুণের রক্তের গ্রুপের অসঙ্গতি, জন্মের সময় গুরুত্বর জন্ডিসে আক্রান্ত ইত্যাদি কারণও মস্তিষ্কের ক্ষতি এবং সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।
এছাড়াও জন্মের সময় ভ্রুণের শ্বাসযন্ত্রের সমস্যাগুলো মস্তিষ্কের আগে ক্ষতির ইঙ্গিত দেয়। শিশুদের নানা সংক্রমণ, বিষক্রিয়া এবং মাথায় গুরুত্বর আঘাত হচ্ছে সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত হওয়ার কিছু সাধারণ কারণ।
চিকিৎসাঃ
সেরিব্রাল পালসির কোনো চিকিৎসা বা প্রতিকার নেই। তবে চিকিৎসক কিছু ঔষধ সেবনের নির্দেশ দেয় যা পেশী শিথিল করে। এর পাশাপাশি রোগীর খিঁচুনি প্রতিরোধেও কিছু ঔষধ সেবনের পরামর্শ দেন।
এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার মূল কর্মসূচির লক্ষ্য হচ্ছে শিশুএ মানসিক ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার উন্নতি ঘটানো। এর ফলে রোগী সংবেদনশীল, মোটর এবং বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটাতে পারে। যার ফলে রোগীর দ্বায়বদ্ধতা পূরণ করা সম্ভব হয়।
