এরিথ্রোসাইটোসিস এমন এক রোগ যা মানুষের রক্তে লোহিত রক্ত কণিকার (RBC) পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করে দেয়। লোহিত কণিকার এই অতিরিক্ত বৃদ্ধি নানা রকম স্বাস্থ্যগত জটিলতা সৃষ্টি করে। যার কারণে এই রোগের কারণ, লক্ষণ রোগ নির্ণয় এবং রোগের বিকল্প চিকিৎসাগুলো প্রদান করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে।
এরিথ্রোসাইটোসিস প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ণয় এবং অন্তর্নিহিত কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যাসমূহের জটিলতাগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে সঠিক চিকিৎসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার, যদি কোনো রোগের কারণে কোনো ব্যক্তি এরিথ্রোসাইটোসিসে আক্রান্ত হয়, তাহলে সেই রোগ নির্ণয়, রোগীর জটিলতাগুলোর কার্যকর ব্যবস্থানা ও প্রতিরোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তে এরিথ্রোসাইট বা লোহিত রক্ত কণিকার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়াকে এরিথ্রোসাইটোসিস বলে। একে প্রধান দুইটি ধরণে ভাগ করা যায়। একটি হচ্ছে প্রাথমিক এরিথ্রোসাইটোসিস, যা মানুষের অস্থিমজ্জাকে প্রভাবিত করে এবং অভ্যন্তরীণ কিছু কারণে ঘটে থাকে। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সেকেন্ডারি এরিথ্রোসাইটোসিস, যা লোহিত রক্ত কণিকার উৎপাদনকে উদ্দীপিত করে এবং পাশাপাশি বাহ্যিক কিছু কারণে সৃষ্টি হয়। লোহিত রক্ত কণিকা বৃদ্ধির কারণে ঘন হয়ে যেতে পারে। যার কারণে রক্ত জমাট বাঁধা, উচ্চ রক্তচাপ বা হাই প্রেসারসহ অন্যান্য কার্ডিও ভাসকুলার বা হৃদরোগের জটিল কিছু রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
কারণ বা ঝুঁকির কারণঃ
এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার বেশ কিছু কারণ আছে। আবার বেশ কিছু ঝুঁকির বিষয় আছে যা মানুষকে এই রোগে আক্রান্ত করতে পারে। এই সকল কারণ ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে-
★ সংক্রমক/পরিবেশগত কারণঃ
যাদিও এরিথ্রোসাইটোসিস সাধারণত সংক্রমণের কারণে হয় না। তবে পরিবেশগত কিছু কারণ এই রোগে আক্রান্ত হতে বা রোগের বিকাশ ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, অধিক উচ্চতায় বসবাসের কারণে বায়ুমন্ডল থেকে কম মাত্রায় অক্সিজেন পাওয়া যায়। যারা এমন অধিক উচ্চতায় বসবাস করে তাদের সেকেন্ডারি এরিথ্রোসাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে। অক্সিজেনের প্রাপ্যতা হ্রাসের কারণে ফুসসুস, হার্ট ও ব্রেন শরীরকে আরও বেশি লোহিত রক্ত কণিকা তৈরি করার জন্য প্ররোচিত করে।
★ জেনেটিক/আটোইমিউনঃ
জেনেটিক মিউটেশনের সাথে প্রাইমারি বা প্রাথমিক এরিথ্রোসাইটোসিস অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যুক্ত। যেমন, JAK2 জিনকে এই রোগ প্রভাবিত করে, যা রক্ত কণিকা উৎপাদনে ভূমিকা পালন করে। এছাড়া পলিসাইথেমিয়া ভেরার মত রোগ আক্রান্ত ব্যক্তির অতিরিক্ত রক্ত কণিকা উৎপাদনের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার ফলে এই রোগীরা এরিথ্রোসাইটোসিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
আবার, অটোইমিউন রোগগুলোও লোহিত রক্ত কণিকা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শরীরের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে রোগীকে এরিথ্রোসাইটোসিসে আক্রান্ত করতে অবদান রাখতে পারে।
★ জীবনধারা এবং খাদ্যতালিকাঃ
অনিয়মিত জীবনধারা এবং কিছু খাদ্যাভাসের কারণে এরিথ্রোসাইটোসিস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ধূমপানে অভ্যস্ত ব্যক্তির দীর্ঘস্থায়ী হাইপোক্সিয়া (অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া) হতে পারে। যার ফলে শরীরকে আরও বেশি লোহিত রক্ত কণিকা তৈরী করতে এই রোগ প্ররোচিত করে থাকে।
আবার, অতিরিক্ত হাইড্রেশনের কারণে শরীরে প্লাজমা কমে যেতে পারে। আর প্লাজমা কমে গেলে কোষের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। কোষের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেলে লোহিত রক্ত কণিকার সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।
মূল ঝুঁকির কারণঃ
উপরোক্ত কারণসমূহ ছাড়াও এরিথ্রোসাইটোসিস আক্রান্ত হওয়ার আর কিছু কারণ রয়েছে। যেগুলোকে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার মূল কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এগুলো হচ্ছে-
বয়সঃ
এই রোগে আক্রান্তের সাথে বয়সের একটি সংযোগ আছে। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশেষ করে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
অন্তর্নিহিত রোগঃ
দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, একাধিকবার যক্ষা ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত, হৃদরোগ, অধিক স্থুলাকায় এবং কিছু টিউমার লোহিত রক্ত কণিকা উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে সক্ষম।
জেন্ডারঃ
মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। অর্থাৎ পুরুষেরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে।
ভৌগোলিক অবস্থানঃ
উচ্চ উচ্চতায় অর্থাৎ পাহাড়ের চূড়ায়, বা সমতল থেকে উঁচু এমন দেশে বসবাসকারী ব্যক্তিদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। মূলত উচ্চতা যত বাড়তে থাকে অক্সিজেনের পরিমাণ তত কমতে থাকে। আর অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকায় মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়।
লক্ষণসমূহঃ
সাধারণ লক্ষণঃ
এরিথ্রোসাইটোসিস সব সময় লক্ষণীয় লক্ষণ প্রকাশ নাও করতে পারে। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীর শরীরে কোনো প্রকার লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তবে, রোগীর সমস্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে কিছু লক্ষণ দেখা যেতে পারে। লক্ষণগুলো হতে পারে-
★ মাথাব্যথাঃ
রক্তে লোহিত রক্ত কণিকা বৃদ্ধির ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির মাথাব্যথা হতে পারে।
★ মাথা ঘোরা বা হালকা মাথা ব্যথাঃ
মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে রোগী মাথা ঘোরা বা হালকা মাথা ব্যথা অনুভব করতে পারে। আবার একই সাথে উভয়টিই অনুভব হতে পারে।
★ ক্লান্তিঃ
হৃদপিন্ড এবং রক্ত সংবহনতন্ত্রের উপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়লে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ক্লান্তি অনুভব করাতে পারে।
★ ঝাপসা দৃষ্টিঃ
রক্ত প্রবাহের পরিবর্তন দৃষ্টিশক্তির উপর প্রভাব ফেলতে পারে। যার প্রভাবে আক্রান্ত ব্যক্তি চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করতে পারে।
★ লাল বা বেগুনি ত্বকঃ
লোহিত রক্ত কণিকা বৃদ্ধি এবং অক্সিজেন কমে যাওয়ার কারণে রোগীর ত্বক এবং ভেন লালচে বর্ণ বা বেগুনি বর্ণ ধারণ করতে পারে।
তাৎক্ষনিক চিকিৎসার জন্য সতর্কতামূলক লক্ষণঃ
এরিথ্রোসাইটোসিসের সাথে সম্পর্কিত কিছু লক্ষণ রোগের গুরুত্বর জটিলতার নির্দেশনা দিয়ে থাকে। এসব লক্ষণ কারও মাঝে দেখা দিলে দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। এই লক্ষণগুলো হচ্ছে-
১. বুক ব্যথাঃ
এই রোগে আক্রান্ত রোগীর বুক ব্যথা হার্ট অ্যাটাক বা পালমোনারি এমবোলিজমের ইঙ্গিত দিতে পারে। এমন লক্ষণ দেখা দিলে বিলম্ব করা মোটেও উচিত নয়।
২. নিশ্বাসের দুর্বলতাঃ
শ্বাসকষ্ট ফুসফুসের পাশাপাশি হৃদরোগের গুরুত্বর সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। এমনটা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎকের স্মরণাপন্ন হতে হবে। এমনকি রোগীকে দ্রুত অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
৩. তীব্র মাথাব্যথাঃ
যদি এই রোগে আক্রান্ত রোগীর তীব্র মাথাব্যথা দেখা দেয় এবং সাধারণ চিকিৎসায় কোনো ফল পাওয়া না যায়, সেক্ষেত্রে দ্রুত রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। না হলে রোগীর স্ট্রোক এবং মাথার নার্ভ ছিঁড়ে রক্ত ক্ষরণ হতে পারে।
৪. অসাড়তা বা দুর্বলতাঃ
হঠাৎ করে যদি এই রোগে আক্রান্ত রোগীর শরীরের একপাশে অসাড়তা বা দুর্বলতা দেখা দেয় তাহলে এই লক্ষণটি রোগীর স্ট্রোকের ইঙ্গিত হতে পারে। এক্ষেত্রে চিকিৎসায় যত বিলম্ব করা হবে রোগীর জন্য তত ক্ষতি বা বিপদের কারণ হতে পারে। শুধু এই রোগে আক্রান্ত রোগী নয়, যে কোনো ব্যক্তির শরীরে এরকম লক্ষণ দেখা দিকে দ্রুত ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হওয়া জরুরী।
রোগ নির্ণয়ঃ
এরিথ্রোসাইটোসিস নির্ণয়ের জন্য বেশ কিছু উপায় রয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে-
ডিফারেন্সিয়াল নির্ণয়ঃ
একই রকম লক্ষণ বা পরীক্ষাগারের রিপোর্টসহ অন্যান্য রোগ থেকে এরিথ্রোসাইটোসিসকে আলাদা করার বিকল্প কিছু নেই। রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়ার সময় ডিহাইড্রেশন, COPD বা দীর্ঘস্থায়ী অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ এর পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট টিউমারের মতো রোগকে এক্ষেত্রে বিবেচনা করা জরুরী।
ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নঃ
এরিথ্রোসাইটোসিস রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম পুঙ্খানুপুঙ্খ ক্লিনিক্যাল কিছু টেস্টের রিপোর্টকে মূল্যায়ন করা হয়। ক্লিনিক্যাল টেস্টের মধ্যে রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস এবং শারীরিক পরীক্ষা অন্তর্গত। এক্ষেত্রে ডাক্তার রোগের লক্ষণ, চিকিৎসার ইতিহাস এবং সম্ভাব্য সকল ঝুঁকির কারণগুলো মূল্যায়ন করে কিছু পরীক্ষা করবেন।
ডায়াগনস্টিক পরীক্ষাসমূহঃ
এই রোগ নিশ্চিত করার জন্য বেশ কিছু ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা করতে দিয়ে থাকেন। এসব পরীক্ষার মধ্যে থাকে–
কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (CBC):
CBC এর মাধ্যমে রোগীর রক্তে লোহিত রক্ত কণিকার সংখ্যা, হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ এবং লোহিত রক্ত কণিকা দ্বারা দখলকৃত রক্তের আয়োতনের অনুপাত অর্থাৎ হেমোটোক্রিকের পরিমাপ করা হয়।
বোনম্যারো বায়োপসিঃ
কিছু ক্ষেত্রে রক্ত কণিকার উৎপাদন মূল্যায়ন করার জন্য এবং পলিসাইথেমিয়া ভেরার মত রোগ আছে কিনা তা নির্ণয় করার জন্য বোনম্যারো বায়োপসি করার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
এরিথ্রোপয়েটিন স্তরঃ
লোহিত রক্ত কণিকার উৎপাদনকে উদ্দীপিত করে এমন একটি হরমোন এরিথ্রোপয়েটিন, যা পরিমাপ করলে রোগী প্রাথমিক নাকি মাধ্যমিক পর্যায়ের এরিথ্রোসাটোসিসে আক্রান্ত তা নির্ণয় করা যায়।
জেনেটিক টেস্টিংঃ
২টি জিনের মিউটেশন পরীক্ষা করার মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ের এরিথ্রোসাইটোসিস নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা যায়। এজন্য ডাক্তার জেনেটিক টেস্ট দিতে পারে।
বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতিঃ
এরিথ্রোসাইটোসিসের চিকিৎসা কি বা কেমন হবে তা নির্ভর করে রোগটির অন্তর্নিহিত কারণের উপর। রোগের লক্ষণের ভিত্তিতে যে সকল চিকিৎসা করা হতে পারে সেগুলো হচ্ছে-
ফ্লেবোটমিঃ
এই চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর রক্তের লোহিত রক্ত কণিকার ভর কমাতে এবং রক্তের সান্দ্রতা কমাতে শরীর থেকে রক্ত বের করে ফেলা হয়৷ এই পদ্ধতিটা রক্তদানের মত। রোগীর শরীর থেকে ব্লাড ব্যাগে রক্ত নিয়ে সেই রক্ত ফেলে দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিটা মূলত প্রাথমিক এরিথ্রোসাইটোসিসের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়।
মেডিকেশনঃ
কিছু ক্ষেত্রে লোহিত রক্ত কনিকার উৎপাদন করাতে হাইড্রোক্সিউরিয়া জাতীয় ঔষধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়। আবার রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমানোর জন্য এসপিরিন জাতীয় ঔষধও সেবনের সুপারিশ করা হতে পারে।
অক্সিজেন থেরাপিঃ
ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণে সেক্বন্ডারি এরিথ্রোসাইটোসিসে আক্রান্ত রোগীদের অক্সিজেনের মাত্রা বৃদ্ধি করার জন্য রোগীকে অক্সিজেন নিতে হতে পারে।
অ-ফার্মাকোলজিক্যাল চিকিৎসাঃ
এরিথ্রোসাইটোসিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে জীবন-যাপনে বেশ কিছু পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এসকল পরিবর্তনের মধ্যে থাকতে পারে-
★ জনয়োজনঃ
এরিথ্রোসাইটোসিসের আক্রমণ বা এর তীব্রতা থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে ভালোভাবে হাইড্রেড থাকা জরুরী। হাইড্রেড থাকা রক্তের সর্বোত্তম সান্দ্রতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে সক্ষম।
★ ধুমপান ত্যাগঃ
ধুমপান ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর। ধুমপান ত্যাগের মাধ্যমে ফুসফুসের সামগ্রিক কার্যকারিতা উন্নত হতে পারে। আর এর ফলে রোগের জটিলতার ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
★ খাদ্যতালিকার পরিবর্তনঃ
ধুমপান, ফাস্ট ফুড ইত্যাদি ত্যাগ করার পাশাপাশি ফলমূল, শাক-সবজি এবং গোটা শস্য সমৃদ্ধ (ফাইবার) সুষম খাবার গ্রহণের মাধ্যমে সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে উন্নত করা সম্ভব। আর শারীরিক উন্নতির পাশাপাশি এরিথ্রোসাইটোসিস নিয়ন্ত্রণে রাখতেও এসকল খাবার সাহায্য করতে পারে।
বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর এবং বিভিন্ন বয়সের রোগীর চিকিৎসার জন্য আলাদা আলাদা কিছু পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হতে পারে। সেগুলো হচ্ছে-
শিশু রোগীঃ
শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার মূল লক্ষ্য থাকে অন্তর্নিহিত রোগ বা কারণের সমাধান এবং এই রোগের বৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা।
জেরিয়াট্রিক রোগীঃ
বয়স্ক এবং প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর ক্ষেত্রে এই রোগের পাশাপাশি অন্যান্য রোগ বা সহ-রোগ দেখা দিলে যত্নশীল ব্যবস্থাপনা এবং সম্ভাবত ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে চিকিৎসা দেওয়ার পরিকল্পনা করতে হতে পারে।
জটিলতাঃ
জটিলতার ক্ষেত্রে কয়েক শ্রেনীর জটিলতা থাকতে পারে। যা গুরুতের সাথে বিবেচনা করা জরুরী৷ এসকল শ্রেনীর মধ্যে রয়েছে-
১. সম্ভাব্য জটিলতাঃ
যদি এরিথ্রোসাইটোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা করা না হয় এবং এই রোগ খারাপের দিকে যেতে থাকে, তাহলে এই রোগ কিছু জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। আর এসব জটিলতার মধ্যে থাকতে পারে –
হাইপারটেনশনঃ
চিকিৎসা না করার কারণে রক্তের পরিমাণ রবং সান্দ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে এরিথ্রোসাইটোসিস থেকে রক্তচাপ বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
থ্রাম্বোসিসঃ
এই রোগের কারণে রক্তের সান্দ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। আর রক্ত জমাট বাঁধার কারণে স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের মত গুরুত্বর অবস্থা ঘটতে পারে।
অঙ্গের ক্ষতিঃ
দীর্ঘস্থায়ী সময় ধরে এরিথ্রোসাইটোসিসে আক্রান্ত থাকলে রোগীর রক্ত প্রবাহ কমে যায়। যার কারণে মস্তিষ্ক, হৃদপিন্ড এমনকি কিডনির বড় ক্ষতি হতে পারে। পাশাপাশি রোগীর ভ্যারিকাস ভেইনে আক্রান্ত হওয়ারও প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।
২. স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি জটিলতাঃ
স্বল্পমেয়াদি জটিলতার মধ্যে তীব্র কার্ডিওভাসকুলারের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। অপরপক্ষে হৃদরোগ এবং কিডনি ফেইলিউরের মতো দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি নানা রকম স্বাস্থ্য সমস্যাও দেখা দিতে পারে রোগীর মাঝে।
প্রতিরোধঃ
এরিথ্রোসাইটোসিস প্রতিরোধের জন্য পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকির কারণগুলো মোকাবেলা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুস্থ রাখার প্রচেষ্টা করতে হবে। এসকল প্রচেষ্টার মধ্যে থাকতে পারে-
১. টিকাঃ
টিকা সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম। যথাসময়ে টিকা নেওয়ার মাধ্যমে সেকেন্ডারি এরিথ্রোসাইটোসিস থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব।
২. নিয়মিত চেক-আপঃ
নিয়মিত চেকাপের মাধ্যমে প্রথমিক পর্যায়ের যে কোনো রোগ সনাক্ত করা সম্ভব। আর প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ সনাক্ত করা গেলে যেকোনো রোগের চিকিৎসা প্রদান করা সহজ হয়ে যায়।
৩. সুস্থ জীবনধারাঃ
নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্যাভাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধুমপান থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে এরিথ্রোসাইটোসিস হওয়ার ঝুঁকি থেকে নিরাপদে থাকা যায় বা ঝুঁকি কমানো যায়।
কিছু পরামর্শঃ
এরিথ্রোসাইটোসিসে আক্রান্তের ঝুঁকি এড়াতে কিছু বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরী। এসবের মধ্যে রয়েছে-
জলয়োজনঃ
প্রচুর পরিমাণে পানি বা তরল পান করতে হবে। বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় এবং শারীরিক পরিশ্রমের পরে প্রচুর পরিমাণে পানিয় পান করতে হবে।
উচ্চতা এড়িয়ে চলতে হবেঃ
যতটা সম্ভব উচ্চ উচ্চতা এড়িয়ে চলতে হবে। বিশেষ করে যাদের হাইট ফোবিয়া, হার্টের সমস্যা বা অন্য কোনো রোগ আছে তাদের উচ্চ উচ্চতা এড়িয়ে চলা জরুরী।
অক্সিজেনের মাত্রা পর্যবেক্ষণঃ
দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত অক্সিজেনের মাত্রা চেক-আপ করা উচিত। অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকা এরিথ্রোসাইটোসিসে আক্রান্ত হওয়াকে ইঙ্গিত করতে পারে।
এরিথ্রোসাইটোসিসে আক্রান্ত রোগীদের রোগ নির্ণয়, অন্তর্নিহিত কারণ এবং চিকিৎসার কার্যকারিতা ইত্যাদির উপর নির্ভর রোগের অবস্থা পরিবর্তিত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনা রোগীকে সুস্থ করতে সহায়তা করতে পারে।
বেশ কিছু কারণ সামগ্রিক পূর্বাভাসকে প্রভাবিত করতে পারে। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে-
★ রোগ নির্ণয়ঃ
সময়মতো এরিথ্রোসাইটোসিস সনাক্ত করা গেলে কার্যকর চিকিৎসা এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
★ চিকিৎসা ও আনুগত্যঃ
চিকিৎসকের নির্দেশমতো নির্ধারিত চিকিৎসা গ্রহণ এবং জীবনধারার পরিবর্তন মেনে চললে উল্লেখযোগ্যভাবে এই রোগের ফলাফল উন্নতির দিকে যায়।
★ অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্যস্বাস্থ্য মূল্যায়নঃ
এরিথ্রোসাইটোসিসে আক্রান্ত রোগীর অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা বা রোগ থাকলে রোগীর রোগ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তুলতে পারে। পাশাপাশি এই রোগের পূর্বাভাসকে প্রভাবিত করতে পারে।
আরও পড়ুনঃ পলিসাইথেমিয়া কি?
