পারকিনসন রোগ কী, এই রোগের ভয়াবহতা কতটা এগুলো সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি না। অথচ প্রতিনিয়ত আমাদের দেশে পারকিনসন রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর এই রোগ বৃদ্ধির সাথে সাথে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ডাক্তারগণ।
পারকিনসন রোগ কী, কেন হয় এই রোগ, রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা এবং প্রতিরোধের উপায় কী? এগুলো নিয়েই এই আর্টিকেলটি লেখা।
পারকিনসন রোগ কীঃ
পারকিনসন হচ্ছে স্নায়ুতন্ত্রের এক ধরনের রোগ যা এজিং প্রসেসের কারণে অর্থাৎ বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এই রোগটি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে থাকে।
জন্মের পর প্রতিদিন একটু একটু করে আমাদের হাত-পা, চোখ-নাক, মস্তিষ্কসহ শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বড় হয় আবার ৪০ থেকে ৫০ বছরের পর থেকে প্রতিনিয়ত এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো ক্ষয় হতে শুরু করে৷ বয়স বাড়লে চোখে কম দেখা, চুল-দাড়ি পাকা, চামড়ায় ভাঁজ পড়ার পাশাপাশি মস্তিষ্কেরও ক্ষয় হয়।
মূলত মস্তিষ্কের ক্ষয় জনিত বিশেষ রোগই হচ্ছে পারকিনসন। যখন মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অংশের কার্যক্ষমতা কমে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়, তখন শরীরে যে প্রভাব দেখা যায়, সেটাকে পারকিনসন বলা হয়।
ডোপামিন নামক নিউরোট্রান্সমিটার কমতে শুরু করলে বা এর ঘাটতি দেখা দিলে পারকিনসন রোগটি রোগীর শরীরে দেখা যায়। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ধীরে ধীরে ডোপামিন লেভেল কমতে থাকে। আর ডোপামিন লেভেল কমে গেলে রোগীকে বাহির থেকে সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয়।
কিন্তু সাপ্লিমেন্ট দিতে দিতেও একটা সময় দেখা যায় রোগীর অবস্থা এত খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে যে, ডোপানিন সাপ্লিমেন্ট রোগীর শরীরে/মস্তিষ্কে কাজ করছে না, বা যতটুকু কাজ করছে তাতে খুব বেশি লাভ হচ্ছে না।
পারকিনসন রোগের সবচেয়ে খারাপ দিক হচ্ছে এই রোগের লক্ষণ শুরুর দিকে রোগীর মাঝে তেমন একটা বুঝা যায় না। সময় বৃদ্ধির সাথে সাথে এর লক্ষণ ধীরে ধীরে রোগীর মাঝে স্পষ্ট হতে থাকে। অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের এক হাতে অনিয়ন্ত্রিত কাঁপুনি হচ্ছে। পরবর্তীতে হাঁটাচলা, কথা বলা এমনকি ঘুমানোর ক্ষেত্রেও এই রোগের প্রভাব পড়তে শুরু করে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আমাদের দেশে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির সাথে সাথে বিপদজনক এই পারকিনসন রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বেড়ে গেছে।
রোগের কারণঃ
পারকিনসন রোগের কোনো নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে এখনো গবেষণায় জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয় জিনগত সমস্যা থেকে এই রোগটি হতে পারে। বিশেষ করে জেনেটিক মিউটেশন হয়ে তরুণরা পারকিনসন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বয়স্করাও জেনেটিক কারণে পারকিনসন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা খুবই কম। আবার বাবা-মা, ভাই-বোন বা নিকট আত্মীয়-স্বজনের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকলে পরবর্তীতে পরিবারের যে কেউ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
এছাড়াও দূষিত পরিবেশে বসবাস, বিষাক্ত পরিবেশে বা রাসায়নিক কারখানায় কাজ করলে পারকিনসনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় বলে গবেষণায় জানা যায়।
আমাদের মস্তিষ্কের ভিতরে ঝোঁপের মতো কিছু জড়বস্তুর উপস্থিতি যা লুই বডি নামে পরিচিত, এদের পারকিনসন রোগের সাইন বা চিহ্ন বলা হয়। অনেক সময় মস্তিষ্কে এই লুই বডি বেশি জমা হলে মস্তিষ্কের কিছু অংশ অকেজো হয়ে পারকিনসন হতে পারে।
সচরাচর নারীদের তুলনায় পুরুষদের পারকিনসন রোগে বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যায়। তাই পুরুষের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি বলা হয়।
রোগের লক্ষণঃ
পারকিনসন রোগের লক্ষণগুলো সকল রোগীর জন্য একই রকম নয়। অধিকাংশ বা প্রায় সকল রোগীর ক্ষেত্রে শুরুর দিকে এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। রোগের তীব্রতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীর শরীরের যেকোনো একপাশে লক্ষণগুলো দেখা দিতে শুরু করে। পরবর্তীতে শরীরের উভয় পাশই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে এবং উভয় পাশেই লক্ষণগুলো প্রকাশ পেয়ে থাকে। সাধারনত ৫০ বছর পার হলে মানুষের মাঝে পারকিনসন রোগের লক্ষণগুলো দেখা দিতে শুরু করে
লক্ষণগুলোর মধ্যে থাকতে পারে-
১. শুরুতে হাত-পা কাঁপা শুরু হয়৷ প্রথমে এক পাশের হাত-পা কাঁপে এবং পরবর্তীতে দুই হাত-পা কাঁপে।
২. হাত ও পায়ের মাংসপেশি শক্ত হয়ে যায়, ব্যথা অনুভব হয় এবং এর প্রভাবে রোগীর চলাচল করতে সমস্যা হয়।
৩। হাত-পায়ের রক্ত সঞ্চালন কমে যায়৷ ফলে রোগীর নড়াচড়া কমে যায় এবং নড়াচড়ার গতি কমে যায়।
৪. আর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন অর্থাৎ হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ানোর সময় রক্তচাপ কমে যাওয়ার ফলে মাথা ঘোরা বা মাথা ঝিমঝিম করার প্রবণতা দেখা যায়।
৫. শারীরিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়, ফলে চলাচলের সময় পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
৬. রোগীর ঘুম কম হয় এবং স্মৃতিশক্তি কমে যায়।
এসব লক্ষণ ছাড়াও পারকিনসন রোগীর মাঝে আরো কিছু লক্ষণ দেখা যেতে পারে৷ এসব লক্ষণের মধ্যে থাকতে পারে-
★ অনেক সময় মুখ দিয়ে লালা ঝরতে দেখা যায়।
★ উঠা-বসা বা হাঁটা-চলা দেরিতে শুরু হয়।
★ হাঁটার সময় ছোট ছোট পা ফেলে হাঁটা।
★ ভাবলেশহীন মুখ।
★ মানসিক কিছু সমস্যা যেমন- উদ্বেগ, দুঃশ্চিন্তা, হতাশা, হ্যালুসিনেশন হয়।
★ কোনো পাশে ঘুরতে গেলে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে দেখা যায়।
★ রোগীর কথা জড়িয়ে আসে। অনেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে দ্রুত কথা বলে।
★ লিখতে গেলে সমস্যা হয় বা লিখতে পারে না।
★ আগে দৈনন্দিন কাজগুলো যেভাবে করতো সেই কাজগুলো পূর্বেএ মতো করতে পারে না।
★ কোষ্ঠকাঠিন্য হয়।
★ কোনো কাজ, কথা বা কোথাও কিছু রাখলে তা মনে করতে পারে না।
চিকিৎসাঃ
পারকিনসন রোগের চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ নিউরোলজিস্টের স্মরণাপন্ন হতে হবে। রোগীর লক্ষণ এবং ইতিহাস পর্যালোচনা করে নিউরোলজিক্যাল ও শারীরিক উভয় প্রকারের পরীক্ষার সমন্বয়ে রোগ এবং রোগের ধরন শনাক্ত করবেন। প্রয়োজনে চিকিৎসক ডোপামিন ট্রান্সপোর্টার টেস্ট করার নির্দেশনা প্রদান করতে পারেন। এসব টেস্ট ছাড়াও MRI, CT-SCAN এর মত ম্যাগনেটিক টেস্টের পাশাপাশি ব্লাড টেস্টের প্রয়োজন হতে পারে। রোগ নির্ণয় করা গেলে রোগের ধরন এবং তীব্রতা অনুযায়ী রোগীকে কিছু ঔষধ নিয়মিত সেবন করার পরামর্শ দেওয়া হবে। এসব ছাড়াও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের অবস্থা বিবেচনা করে রোগীর ব্রেনের সার্জারী করার প্রয়োজন হতে পারে।
প্রতিরোধের উপায়ঃ
পারকিনসন রোগ প্রতিরোধ করতে হলে আমাদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যকর খাবার, আঁশযুক্ত খাবার বেশি বেশি খেতে হবে। ফল-মূল, শাকসবজি খেতে হবে আর পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে প্রতিদিন। এসব ছাড়াও ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডযুক্ত খাবার পারকিনসন রোগ প্রতিরোধে দারুণ উপকারী। তাই ওমেগা-৩ যুক্ত খাবার বিশেষ করে পাঙ্গাশ মাছ, সামুদ্রিক মাছ খেতে হবে। এসব খাবার খাওয়ার পাশাপাশি বাহিরের অস্বাস্থ্যকর ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম করতে এববগ সাঁতার কাটতে হবে। আবার বাগান করাও রোগীর জন্য উপকারী হতে পারে।
আর যদি কারো পারকিনসন রোগ হয়েই যায়, তাহলে কিছু সতর্কতা মেনে চলা খুবই জরুরী। বিশষ করে হাঁটাচলায় সতর্ক থাকতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে হাঁটতে হবে। জোরে হাঁটলে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার এবং আহত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। রোগীর ভারসাম্যহীনতা যেন না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে৷ রোগীর চিকিৎসা এবং দেখাশোনা করার জন্য প্রয়োজনে একজন সহযোগী রাখতে হবে।
