COPD-র ঝুঁকি, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পদ্ধতি

পূর্বের পোস্টে আপনাদের COPD রোগ কি, এর লক্ষণ কি কি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছি। এই পোস্টে এই রোগের ঝুঁকি, নির্ণয় পদ্ধতি ও চিকিৎসা সম্পর্কে আলোচনা করবো৷ তাহলে চলুন জেনে নেই বিস্তারিত।

ঝুঁকি ও কারণঃ

প্রাথমিক পর্যায়ে COPD সনাকতকরণ ও প্রতিরোধ করার জন্য এই রোগের ঝুঁকি এবং কারণগুলো সম্পর্কে জানা বা বুঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিওপিডি-র প্রধান ঝুঁকিসমূহ ও কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-

ধুমপান:
সিগারেট হচ্ছে এই রোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধাণ কারণ। অধূমপায়ীর তুলনায় ধূমপায়ীদের COPD রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এবং ধূমপানের সময় এবং আসক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে থাকে। COPD তে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ৮০-৯০% রোগীর ক্ষেত্রে ধুমপানের বা সিগারেট টানার ইতিহাস পাওয়া যায়। তামাকের ধোঁয়ার ক্ষতিকর রাসায়নিকগুলো শ্বাসনালী এবং ফুসফুসের টিস্যুতে জ্বালাতন সৃষ্টি করে। যা ফুসফুসের টিস্যুগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ এবং বাতাস প্রবাহে বাঁধা সৃষ্টি করে।

সেকেন্ডহ্যান্ড ধোঁয়াঃ
সেকেন্ডহ্যান্ড ধোঁয়া বলতে পরোক্ষ ধোঁয়াকে বুঝানো হয়। সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোকের এক্সপোজার, যা প্যাসিভ স্মোকিং বা পরিবেশগত তামাকের ধোঁয়া নামেও পরিচিত। অন্য কারও সিগারেট, পাইপ বা সিগার থেকে নির্গত ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে নিজের ফুসফুসে প্রবেশ করলে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে যারা অধূমপায়ী তাদের ফুসফুসের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি৷ এই ধরণের ধোঁয়া COPD তে আক্রান্ত হওয়ার আরেকটি কারণ।

বয়সঃ
COPD যে কোনো বয়সের মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। তবে সাধারণত ৪০ বছরের অধিক ব্যক্তিদের এই রোগে বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যায়। মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। আর সেই সাথে স্বাভাবিকভাবেই কমতে থাকে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা। যদি ৪০ উর্ধ্ব মানুষে ফুসফুস জনিত সংক্রামণে আক্রান্তের ইতিহাস থাকে বা ধূমপানের অভ্যাস থাকে তাহলে তা মানুষকে COPD এর বিকাশকে আরও সংবেদনশীল করে তুলে।

শ্বাস প্রশ্বাসের সংক্রমণঃ
একাধিকবার বা গুরুত্বর শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, বিশেষ করে শৈশবকালে এমন সংক্রমণে ফুসফুসের ক্ষতি হয়েছে এমন ব্যক্তিদের পরবর্তী জীবনে COPD তে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস বা ফুসফুসের যক্ষার মত সংক্রমণ রোগ শ্বাসনালীতে প্রদাহ এবং দাগ সৃষ্টি করতে পারে। আর এই দাগ পরবর্তীতে COPD বিকাশে বিশাল ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

পেশাগত এক্সপোজারঃ
রাসায়নিক পদার্থ, ট্যানারির বর্জ্য, ধোঁয়া, কয়লা পোড়ানো হয় এমন স্থান, স্বর্নের দোকানে স্বর্ণ গলানো, গ্যাস ইত্যাদি সূক্ষ্ণ কণার মত নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্রে বায়ু দূষণকারী এবং ধূলিকণার দীর্ঘায়িত এক্সপোজার COPD-এর ঝুঁকি বাড়াতে সক্ষম। এছাড়া খনন, নির্মান, কৃষি এবং উৎপাদনের মতো শিল্পগুলোতে ধোঁয়া বা ধুলাবালি সৃষ্টিকারী পেশাগত ঝুঁকির সংস্পর্শে আসার কারণে সিওপিডি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

বায়ু দূষণঃ
বাইরের বায়ু দূষনের দীর্ঘমেয়াদী এক্সপোজার, যেমন কলকারখানার ধোয়া ও বর্জ্য, পার্টিকুলার ম্যাটার, ট্যানারির আবর্জনা, ওজোন এবং অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাস COPD-র বিকাশ এবং অবনতিতে অবদান রাখতে সক্ষম। দুর্বল বায়ু চলাচলযুক্ত বাড়িতে রান্না এবং গরম করার জন্য কাঠ বা কয়লার মত জ্বালানী পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট বায়ু দূষণও COPD এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

জিনগত কারণঃ
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে জেনেটিক প্রবণতা আছে যা সেই সকল মানুষদের COPD তে আক্রান্ত বা আক্রান্ত রোগীকে আরও সংবেদনশীল করে তুলে। Alpha-1 এন্টিট্রিপসিনের ঘাটতি এমন একটি জেনেটিক রোগ, যা COPD হওয়ার ঝুঁকি বা COPD তে আক্রান্ত থাকা রোগীর রোগ আরও বাড়িয়ে দিয়ে থাকে। বিশেষ করে যারা অধুমপায়ী বা যাদের ধুমপানের ইতিহাস কম তারা ধুমপায়ীদের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসলে তাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

হাঁপানিঃ
হাঁপানিতে আক্রান্ত রোগী বা হাঁপানির ইতিহাস আছে এবং হাঁপানি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে নেই এমন ব্যক্তিদের COPD হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর তারা যদি ধুমপান করে বা পেশাগত ঝুঁকিতে থাকে তাদের COPD হওয়ার তীব্র সম্ভাবণা থাকে।

নির্ণয় পদ্ধতিঃ

সাধারণত প্রাথমিক পর্যায়ে COPD নির্ণয় করাটা খুবই কঠিন একটি কাজ হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমে রোগীর সিম্পটম অনুযায়ী ফুসফুসের কিছু পরীক্ষা দেওয়া হয়। এই পরীক্ষাগুলোর মধ্যে একটি পরীক্ষা হচ্ছে স্পাইরোমেট্রি নামের একটি সাধারণ শ্বাস পরীক্ষা। যদি কোনো ব্যক্তির শ্বাস নিতে দীর্ঘস্থায়ী অসুবিধা হয় তাহলে চিকিৎসক আরও কিছু পরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পরীক্ষাগুলো হচ্ছে-
★ বুকের এক্স-রে,
★ ধমনী রক্তের গ্যাস বিশ্লেষণ,
★ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা,
★ সিটি স্ক্যান ইত্যাদি।

রোগীদের সময়কালের ফ্লেয়ার-আপ বা তীব্রতা অনুযায়ী COPD এর লক্ষণগুলো আরও খারাপের দিকে ধাবিত হতে পারে। এক্ষেত্রে রোগীদের চিকিৎসা নেওয়ার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

চিকিৎসাঃ

রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসে সাহায্য করার জন্য, লক্ষণগুলো উপশম করার এবং সামগ্রিক জীবন-যাত্রার মান উন্নত করার জন্য চিকিৎসকগণ কিছু চিকিৎসা প্রদান করে থাকে। এসব চিকিৎসার মধ্যে সর্বপ্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাই হচ্ছে রোগীর ধূমপান বন্ধ করা। এবং পরিবারে কেউ ধূমপায়ী থাকলে তাকে ধূমপান থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া। এর পাশাপাশি কোনো ক্ষতিকারক কণার সংস্পর্শে আসা থেকে রোগীকে বিরত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এছাড়াও আরও কিছু চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-

ঔষধঃ
রোগীর রোগ উপশমে বেশ কিছু ঔষধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়। এসব ঔষধের মধ্যে ব্রঙ্কোডাইলেটর, ওরাল এবং ইনহেলড স্টেরয়েড অন্তর্ভুক্ত থাকে।

ফুসফুসের থেরাপিঃ
ফুসফুসের থেরাপি প্রদানের মাধ্যমে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। এই ধরণের থেরাপিতে অক্সিজেন থেরাপি এবং এক ধরনের পালমোনারি পুনর্বাসন পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত থাকে।

নন-ইনভেসিভ ভেন্টিলেশন থেরাপি:
এই ধরনের থেরাপিতে বিলেভেল-পজেটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার (BiPAP) এর মত শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে থেরাপি প্রদান করা হয়। এই ধরনের থেরাপি রোগীর ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

সার্জারীঃ
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে সার্জারী ব্যতীত অন্য কোনো উপায় থাকে না। ফুসফুসে বড় ঘা বা বড় ক্ষতি হয়ে গেছে অথবা উপরের পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করার পরেও রোগের উন্নতি না হয়ে অবনতি হচ্ছে, এমন ক্ষেত্রে চিকিৎসক সার্জারীর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এই রোগের ক্ষেত্রে কয়েক ধরনের সার্জারী করা হতে পারে। যেমন- ফুসফুসের ভলিউম কমানোর সার্জারী, বুলেকটমি এমনকি ফুসফুস প্রতিস্থাপনের মতো সার্জারী করা লাগতে পারে।

প্রতিরোধঃ

COPD এর বিকাশ রোধ করার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে ধূমপান ত্যাগ করা। এছাড়াও, এমন পেশা ও পরিবেশ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে হবে, যা আমাদের ক্ষতিকর কণার সংস্পর্শে আনতে পারে। আর ইতিমধ্যে যারা COPD তে আক্রান্ত হয়েছে তাদের রোগ বৃদ্ধি এবং অন্যান্য সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়া থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মনে রাখতে হবে COPD একটি মারাত্মক ও কষ্টদায়ক রোগ। এই রোগে একবার আক্রান্ত হলে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার সুযোগ নেই। তবে সঠিক যত্ন এবং চিকিৎসার মাধ্যমে আর জীবনধারার মান উন্নত করার মাধ্যমে ভালো জীবন-যাপন করা সম্ভব।

আরও পড়ুনঃ ITP থাকতে পারে আপনার শরীরেও।

Leave a Comment