ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা COPD হচ্ছে ফুসফুসের এমন এক রোগ যা আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাসকে প্রভাবিত করে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারে না। পাশাপাশি রোগের বিকাশ বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে সাধারণ দৈনন্দিন কাজ করাও কঠিন ও কষ্টকর হতে থাকে।
COPD হচ্ছে ফুসফুসের ভিন্ন কিছু সমস্যার চূড়ান্ত পরিনতি। এছাড়াও এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এমফিসেমা, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস অথবা উভয় রোগেই আক্রান্ত হতে পারে।
এমফিসেমা ফুসফুসের এলভিওলি বা বায়ু থলির ক্ষতিকে বুঝায়। রোগটিতে আক্রান্ত হওয়ার ফলে এয়ার ব্যাগের দেওয়ালের ক্ষতি হয়, এবং ধীরে ধীরে ফুসফুসের পুরো দেওয়ালকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্থ করে। এই কারণে এলভিওল সঠিকভাবে অক্সিজেন শোষণ করতে হয়ে পড়ে। এলভিওল মূলত ফুসফুসের ভিতরে বাতাস আটকে দেয়। যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস নিতে অসুবিধা বা কষ্ট হয়।
আর দুরারোগ্য ব্রংকাইটিস এমন এক রোগ, যার প্রভাবে ফুসফুসে শ্লেষ্মা তৈরি হয়। এবং ফুসফুস এই শ্লেষ্মা বের করতে পারে না।
COPD এর কারণঃ
COPD এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে-
সিগারেটঃ
COPD এর মূল এবং প্রধান কারণই হচ্ছে সিগারেট তথা ধুমপান করা। মূলত যখন ফুসফুস দীর্ঘ সময়ের জন্য জ্বালাময় গ্যাস বা কণা পদার্থের সংস্পর্শে থাকে তখন এই রোগটিতে মানুষ আক্রান্ত হয়ে থাকে।
যারা সেকেন্ড হ্যান্ড ধূমপান করেন, তাদেরও সময়ের সাথে সাথে COPD হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকে।
পেশাগত কারণঃ
বিভিন্ন ধরণের পেশায় কর্মরত ব্যক্তিদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যেমন: কাঁচা চামড়ার কারখানা, ট্যানারি, অয়েল্ডিংয়ের কাজ ইত্যাদি। আবার বায়ু দূষণও COPD এ আক্রান্ত হওয়ার একটি কারণ হতে পারে।
জেনেটিক রোগঃ
COPD হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে আলফা-১ এন্টিট্রিপসিন (AAT) ঘাটতি নামক একটি জেনেটিক রোগ। এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের COPD তে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সিওপিডির লক্ষণ সমূহঃ
COPD-র সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ শ্বাসকষ্টের সাথে জড়িত। নিশ্বাসের দুর্বলতা, হালকা ব্যায়াম বা দৈনন্দিন কাজেও হাঁপিয়ে যাওয়া এই রোগের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ।
এছাড়াও-
- বুকে টান ধরে থাকা বা বুক ভার ভার লাগা,
সায়ানোসিস (নখের ডগা বা ঠোঁট নীলাভ বর্ণ ধারণ করা) - ঘনঘন শ্বাসযন্ত্র সংক্রমিত হওয়া,
- শক্তির ঘাটতি,
- অপ্রত্যাশিতভাবে ওজন কমে যাওয়া।
- অতিরিক্ত শ্লেষ্মা উৎপাদন হওয়া,
- পরিষ্কার, সাদা বা সবুজাভ শ্লেষ্মার সাথে দীর্ঘস্থায়ী কাশি হওয়া,
- গোড়ালি, পা বা পায়ের কোনো অংশে ফুসকুড়ি, পা ফুলে যাওয়া,
- জ্বর হতে পারে,
- ঘ্রাণ নেওয়া বা নিশ্বাস ছাড়ার সময় বাঁশির মত শব্দ হওয়া।
সাধারণত ফুসফুসের ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত COPD-র লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় না। যে কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করাটা কঠিন হয়ে পড়ে।
জটিলতাঃ
COPD এর কারণে বেশ কিছু জটিলতায় ভুগতে হতে পারে রোগীকে। এসকল জটিলতার মধ্যে রয়েছে:
শ্বাসযন্ত্র সংক্রমণঃ
সিওপিডি আক্রান্ত রোগীদের সর্দি, ফ্লু এবং নিউমোনিয়ার মতো শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ জনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি। এই ধরণের সংক্রমণগুলো শ্বাসকষ্টকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি ফুসফুসের আরও ক্ষতি করতে পারে। এমনকি যক্ষ্মার মত রোগের দিকে রোগীকে ধাবিত করতে পারে।
ফুস্ফুসের ক্যান্সারঃ
COPD আক্রান্ত রোগীদের ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি। দীর্ঘস্থায়ী আলসার বা প্রদাহ এবং সিওপিডি দ্বারা সৃষ্ট ফুসফুসের টিস্যুগুলোর ক্ষতি ফুসফুসে ক্যান্সার জনিত রোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
হৃদপিন্ডজনিত সমস্যাঃ
COPD হার্ট অ্যাটাক, কার্ডিয়াক এরেস্টসহ হৃদরোগের বেশ কিছু রোগের সাথে যুক্ত। এই রোগের সবগুলো কারণ সম্পূর্ণরুপে নির্ণয় না করা গেলেও ফুসফুসের কার্যকারিতায় প্রতিবন্ধকতার কারণে কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেন স্ট্রেন হার্ট সম্পর্কিত জটিলতা সৃষ্টিতে বেশ বড় অবদান রাখতে পারে বলে গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে।
পালমোনারি হাইপারটেনশনঃ
COPD ফুসফুসে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীতে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই অবস্থাকে বলা হয় পালমোনারি হাইপারটেনশন। এই রোগ হৃদপিন্ড এবং ফুসফুসে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে শ্বাস-প্রশ্বাসকে স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করতে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলে।
ডিপ্রেশনঃ
COPD এর সাথে যুক্ত শ্বাস-প্রশ্বাসের অসুবিধাগুলো রোগীর স্বাভাবিক কার্যকলাপকে বাধাগ্রস্থ করে। যার ফলে রোগী স্বাভাবিক কাজ করতে পারে না। যার ফলে রোগীর জীবনযাত্রার মান কমে আসতে থাকে। দীর্ঘদিন এই সমস্যায় আক্রান্ত থাকার ফলে এবং ভীষণ অসুস্থতার সাথে মোকাবেলা করতে করতে রোগীর মাঝে হতাশা বাসা বাঁধতে থাকে। আর এর ফলে রোগী ডিপ্রেশনে ভুগতে পারে।
ভাসকুলার সমস্যাঃ
COPD আক্রাত রোগীর ফুসফুস ও হার্ট স্বাভাবিক কার্যকলাপে দীর্ঘদিন ব্যহত হলে শিরাগুলোতে স্বাভাবিক হারে রক্ত চলাচল করতে পারে না। এর ফলে শিরা উপশিরাগুলোর জায়গায় জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে যেতে পারে। আর দ্রুত এর চিকিৎসা করা না হলে রক্ত জমাট বাঁধা স্থান বা সম্পূর্ণ শিরায় তীব্র ব্যথা অনুভব হতে পারে। এমনকি রোগীকে বাঁচাতে অপারেশন করে সেই অঙ্গ কেটে বাদ দিয়ে দিতে হতে পারে।
আরও পড়ুনঃ COPD এর ঝুঁকি, কারণ ও চিকিৎসা কী?
