পেরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজ (PVD) হচ্ছে এমন এক রোগ, যা অ্যাথেরোমা বা চর্বি এবং ক্যালসিয়াম জমা হয়ে রক্তনালীসমূহ ব্লক বা সরু করে দেয়। ব্লকেজ অথবা সংকীর্ণতার কারণে রক্ত প্রবাহে বাঁধা সৃষ্টি হয়। যার ফলে বেশ কিছু উপসর্গ সৃষ্টি হতে পারে। এই রোগটি প্রধানত আক্রান্ত ব্যক্তির পায়ে এবং পায়ের আঙ্গুল সমূহে দেখা যায়।
ঝুঁকির কারণঃ
পেরিফেয়াল ভাস্কুলার রোগের (পিভিডি) ঝুঁকি বাড়ায় এমন কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১. ধুমপানঃ
এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হচ্ছে ধূমপান। যারা সিগারেট, বিড়ি বা অন্যান্য তামাকজাত দ্রব্য সেবন করে, তাদের পেরিফিয়াল ভাস্কুলার ডিজিজে বেশী আক্রান্ত হতে দেখা যায়।
২. বয়সঃ
এই রোগে আক্রান্তের ক্ষেত্রে বয়সও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সচরাচর ৫০ বছরের বেশি বয়স এমন ব্যক্তিদের এই রোগে বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যায়।
৩. কিছু রোগঃ
ডায়াবেটিস, রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল বা উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘস্থায়ীভাবে ধমনীর ক্ষতি সাধন করতে পারে। যা ধীরে ধীরে পেরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজে পরিণত হতে পারে।
৪. হৃদরোগ ও জীনগত সমস্যাঃ
যারা হৃদরোগে আক্রান্ত এবং যাদের হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস আছে তাদেরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।
৫. জীবনধারাঃ
আসীন বা অলস জীবনধারা, অপুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং ভিটামিনের অভাব পেরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
লক্ষণঃ
পেরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজে ভুগছে এমন অনেক রোগীর মাঝে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না বা তারা কোনো উপসর্গ অনুভব করে না। কিছু PVD এর ক্ষেত্রে কিছু লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে-
ব্যথাঃ
পেরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজের সবচেয়ে কমন বা সাধারণ লক্ষণ হচ্ছে ব্যথা। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁটার বা ব্যায়াম করার সময় সময় পায়ে দুর্বলতা ও ক্লান্তি অনুভব করতে পারে। এই ক্লান্তি বা দুর্বলতা বিশ্রামের সাথে সাথে কমে যায়। পুনরায় হাঁটা বা ব্যায়াম করলে এই ব্যথা আবার দেখা যায়।
এই ব্যথা মূলত উরু, নিতম্ব এবং কাপ মাসলে অনুভূত হয়।

রোগ তীব্র পর্যায়ে চলে গেলে ক্রমাগত ব্যথা হতে থাকে এবং পা নাড়ানো কষ্টকর হয়ে যায়। অনেকের ক্ষেত্রে পা নাড়ানোর ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এরপর পায়ে গ্যাংরিন (পচন) বা আলসার তৈরি হয়। যা উন্নত চিকিৎসায় নিরাময় হয় না। ফলে অস্ত্রপাচারের প্রয়োজন হয়। অনেকের জীবন বাঁচাতে পা কেটে ফেলতে হয়।
দুর্বল বা ভারী অনুভূতিঃ
আক্রান্ত ব্যক্তির পেশী দুর্বল বা ভারী অনুভূতি হতে পারে।
অস্বাভাবিক ঠান্ডাঃ
পায়ের পাতা বা নিচের অংশ অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে যায়৷ বিশেষ করে এক পায়ের চেয়ে অন্য পা বেশি ঠান্ডা হয়ে থাকে।
চামড়ার রঙ পরিবর্তনঃ
পায়ে পা পায়ের চামড়ায় কালচে ছোপ, নীলাভ বা লালচে রঙ বা ফ্যাকাশে দেখাতে পারে।
ক্ষত সারতে দেরিঃ
ঘা বা ক্ষত সারতে দেরি হয়, বা সহজে শুকাতে চায় না।
চামড়ার পরিবর্তনঃ
পায়ের চামড়া পাতলা হয়ে যেতে পারে। অনেকের পায়ের চামড়া ফ্যাকাশে হওয়ার ফলে চকচকে দেখাতে পারে।
নখ ও লোমের পরিবর্তনঃ
পায়ের লোম কমে যায় এবং নখ ধীরে ধীরে বাড়ে।
অন্যান্য লক্ষণঃ
• PVD এর কারণে পুরুষদের ক্ষেত্রে ইরেক্টাল ডিসফাংশন দেখা দিতে পারে।
• পায়ে বা গোড়ালিতে মৃদু পালস বা অনেকের ক্ষেত্রে পালস অনুভব করা যায় না।
রোগ নির্ণয়ঃ
হাঁটা, ব্যায়াম করা বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে যদি পায়ে ব্যথা অনুভব করলে অবশ্যই একজন ভাস্কুলার সার্জনের স্মরণাপন্ন হতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ভাস্কুলার রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করা গেলে রোগের জটিলতা প্রতিরোধ এবং আক্রান্ত অঙ্গ বাঁচানো সম্ভব।
রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক সর্বপ্রথম রোগীর পূর্ব চিকিৎসার ইতিহাস নিয়ে শারীরিক কিছু পরীক্ষা করবেন। PVD নির্ণয়ের জন্য শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসক কিছু মেডিকেল টেস্টের পরামর্শ দিতে পারেন। টেস্টগুলোর মধ্যে রয়েছ-
★ গোড়ালি-ব্রাচিয়াল ইনডেক্সঃ
ব্যায়ামের আগে এবং ব্যায়ামের সময় গোড়ালি ও বাহুর চারপাশের রক্তের পরিমাপ করার জন্য গোড়ালি-ব্রাচিয়াল ইনডেক্স পরীক্ষা করা হয়। যদি পায়ের ধমনীতে ব্লকেজ থাকে তাহলে ধমনীতে রক্তচাপ কম থাকে। আর এমনটা হলে ডাক্তার বুঝে যায় রোগী পেরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজে আক্রান্ত।
★ পালস ভলিউম রেকর্ডিংঃ
পালস ভলিউম রেকর্ডিং টেস্টের মাধ্যমে পায়ের নাড়ির আয়তনের পরিবর্তন পরিমাপ করা হয়। একটি ডিভাইস দ্বারা অক্সিজেনের মাত্রা পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত স্যাচুরেশন প্রোবের মতো একই নীতি ব্যবহার করে পরীক্ষাটি করা হয়।
এই পরীক্ষাটি PVD, অন্য কোনো কারণে ব্যথা নাকি ABI এর কারণে ব্যথা হচ্ছে তা সনাক্ত করতে সহায়তা করে।
★ ভাস্কুলার ইমেজিংঃ
রোগ নির্ণয়ের জন্য একজন ভাস্কুলার সার্জন ডপলার আল্ট্রাসাউন্ড, সিটি এনজিওগ্রাম বা পা ও মাজার এমআরআই এর পরামর্শ দিতে পারেন। এই পরীক্ষাগুলো রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এমআরআই টেস্ট নার্ভের ও মাসলস এর সংকীর্ণতা নির্ণয় করতে, ব্লকেজ স্থান নির্ণয় করতে এবং রোগের তীব্রতা কতটুকু টা নির্ণয় করে থাকে। এছাড়া এন্ডোভাস্কুলার স্টেন্টিং এর মতো রোগীর জন্য কি চিকিৎসা উপযুক্ত, সেই বিষয়ে পরিকল্পনা করতে চিকিৎসককে সহায়তা করে।
চিকিৎসাঃ
প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করা গেলে জীবনধারা পরিবর্তন এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রক্ষা করা যেতে পারে। এছাড়া-
জীবনধারা এবং খাদ্য পরিবর্তনঃ
★ PVD এর উপসর্গ কমানোর জন্য হাঁটা একটি ভালো ব্যায়াম। নিয়মিত হাঁটার ফলে পায়ের ব্যথা এবং অস্বস্তি থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে।
★ যারা স্থুলাকায় বা মোটা, তাদের ধমনীতে জমা হওয়া প্লাক কমাতে ব্যায়াম এবং একই সাথে ডায়েট পরিবর্তন করে ওজন কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
★ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে PVD রোগের জটিলতা কমানো এবং লক্ষণগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব।
★ সুষম খাদ্য গ্রহণ, কম কোলেস্টেরল জাতীয় খাদ্য, সোডিয়াম, ট্রান্স-ফ্যাট এবং উচ্চ ফাইবার যুক্ত খাবার, ভিটামিন ও খনিজ জাতীয় খাবার PVD রোগ বৃদ্ধি রোধে সহায়তা করে।
★ সিগারেট পরিহার করার পাশাপাশি পান, গুটকা, তামাক এবং নেশাজাত দ্রব্য সেবন পরিহার করার মাধ্যমে PVD প্রতিরোধ করা যায়।
মেডিকেশনঃ
পেরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজে আক্রান্ত রোগীকে একজন ভাস্কুলার সার্জনের স্মরণাপন্ন হতে হবে। ভাস্কুলার সার্জন রক্ত সঞ্চালন, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ব্যথা এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের জন্য ঔষধ সেবনের পরামর্শ দিতে পারেন। মনে রাখতে হবে চিকিৎকের নির্দেশ ব্যতীত ঔষধ সেবন করা বা বন্ধ করা যাবে না।
অপারেশনঃ
রোগের তীব্রতা বেশি হলে ভাস্কুলার সার্জন অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। স্টেন্টিং, বেলুন এনজিওপ্লাস্টি, এথেরেক্টমি এবং পেরিফেরাল বাইপাস সার্জারি এই চার ধরণের সার্জারির যে কোনো একটি সার্জারির সিদ্ধান্ত নিতে পারেন চিকিৎসক। মূলত রোগীর উপসর্গ, রোগীর অবস্থা এবং সমস্যার তীব্রতা পর্যালোচনা করে চিকিৎসক সর্বোত্তম চিকিৎসা পদ্ধতিটি বেছে নিবেন। কিছু ক্ষেত্রে রোগীর অস্ত্রপাচারের মাধ্যমে একাধিক স্তরের সম্পূর্ণ ব্লকেজ এবং প্রতিকূল ধমনীর অপারেশন করা সম্ভব হয় না।
এসকল ক্ষেত্রে স্টেম সেল থেরাপি, প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন থেরাপি প্রদানের পাশাপাশি ঔষধ সেবন ও অন্যান্য চিকিৎসা প্রদান করতে হয়।
পরিশেষেঃ
পেরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজ একটি গুরুত্বর রোগ। পায়ের ইনফেকশন বা ঘা যদি দ্রুত সেরে না ওঠে অথবা হাঁটার পরে এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ে তীব্র ব্যথা অনুভব করলে দ্রুত চিকিৎকের স্মরণাপন্ন হতে হবে।
প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসা দেওয়া গেলে অঙ্গ এবং জীবন উভয়টিই বাঁচানো সম্ভব। পাশাপাশি রক্তচাপ ও সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ্য জীবনধারায় জীবন-যাপনের মাধ্যমে PVD রোগের ঝুঁকি এবং রোগ বৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব।
মনে রাখবেন, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।
