সাইকোসোমাটিক ডিসঅর্ডার হচ্ছে এমন এক রোগ, যা শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক বেশ কিছু কারণ দ্বারা সৃষ্ট। যা শরীর ও মানসিক অবস্থাকে খারাপের দিকে নিয়ে যায়। এই রোগের লক্ষণগুলো আক্রান্ত ব্যক্তির উপর নির্ভর করে। তবে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির মাঝে শারীরিক ব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ, বমি বমি ভাব সহ আরও বেশ কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
মূলত এই রোগ স্ট্রেস, বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগসহ মনস্তাত্ত্বিক নানা রোগের কারণে কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে।
সাইকোসোমেটিক ডিসঅর্ডার কিঃ
সাইকোসোমাটিক ডিসঅর্ডার মূলত মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি, যা মন এবং শরীরকে প্রভাবিত করে। এই রোগটি কোনো জিনগত বা পারিবারিক রোগ নয়। তবে যারা এই রোগে আক্রান্ত বা রোগের উপসর্গ আছে তাদের অত্যন্ত কষ্টদায়ক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।
এই ধরণের রোগ সোমাটোফর্ম ডিসঅর্ডার, কানভার্সন ডিসঅর্ডার এবং সোমাটাইজেশন ডিসঅর্ডার নামেও পরিচিত।
সাইকোসোমাটিক রোগটি মানসিক এবং শারীরিক হেলথের সাথে জড়িত। কিছু মানসিক ঘটনা শরীরের উপর প্রভাব ফেলতে পারে৷ ফলে বেশ কিছু লক্ষণ শরীরে ফুটে উঠতে পারে৷ যদিও এই লক্ষণগুলো অগত্যা এক অন্তর্নিহিত চিকিৎসার কারণে হয় না। তবে এই লক্ষণগুলো রোগীর মানসিক অবস্থা বা মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে সমস্যা সৃষ্টি করে থাকে।
সাইকোসোমাটিকের লক্ষণঃ
সাইকোসোমাটিক ডিসঅর্ডারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণটি শারীরিক, বা শরীরে প্রকাশ পায়। শারীরিক এই লক্ষণগুলোর মধ্যে মাথা ব্যথা, পেট ব্যথা এবং ক্লান্তির মতো সমস্যা দেখা যেতে পারে।
এসব লক্ষণ ছাড়া আরও কিছু লক্ষণ রোগীর মধ্যে প্রকাশ পেতে পারে। যেমন- কিছু রোগীর ঘুমের সমস্যা হতে পারে, আবার অনেকের ক্ষেত্রে মনোযোগ বা কিছু মনে রাখতে অসুবিধা হতে পারে।
এছাড়াও আরও কিছু লক্ষণ অনেক রোগীর মাঝে দেখা যায়। এগুলো লক্ষণের মধ্যে থাকতে পারে:
অনিদ্রা
উচ্চ রক্তচাপ
অবসাদ
হৃদস্পন্দন কমে বা বেড়ে যাওয়া
পেটের সমস্যা (যেমন: বদহজম)
শ্বাসকষ্ট
ডার্মাটাইটিস
একজিমা
পাকস্থলীতে ঘা, আলসার,
সাইকোসোমাটিক ব্যথা (মাথা ব্যথা, পেশী ব্যথা, পিঠে ব্যথা ইত্যাদি)।
যদি কোনো ব্যক্তি এই লক্ষণগুলোর মধ্যে কোনটি অনুভব করে তাহলে দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব একজন ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সাইকোসোমাটিক ডিসঅর্ডারের চিকিৎসা রয়েছে। যদি কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয়, তাহলে দ্রুত একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞর স্মরণাপন্ন হওয়া জরুরী। চিকিৎসক রোগীর লক্ষণগুলো পর্যালোচনা করে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ ও সুখী জীবন-যাপন করতে সহায়তা করবেন।
রোগের কারণঃ
অন্যান্য রোগের থেকে সাইকোসোমাটিক ডিসঅর্ডারগুলো আলাদা। কারণ এই রোগগুলো শারীরিক কোনো রোগ বা রোগের প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত নয়। বরং এই রোগের লক্ষণগুলো মনস্তাত্ত্বিক কারণসমূহের মাধ্যমে সৃষ্ট।
সাইকোসোমাটিক রোগের বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এসকল কারণের মধ্যে রয়েছে-
ভয় এবং উদ্বেগঃ
ট্রমা বা অপব্যবহার বা হ্যারাজমেন্টের কারণে এই রোগটি হতে পারে৷ আবার বাহির থেকে কেউ হুমকি অনুভব করলেও এই রোগটিতে আক্রান্ত হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যদি কেউ এমন স্থানে বসবাস করে যেখানে অপরাধের হার অনেক বেশি, সেই স্থানে রাতে হাঁটাহাঁটি করার সময় যে কোন ব্যক্তি আক্রমণের শিকার হওয়ার উদ্বেগে বা হৃদস্পন্দনে এক ধরণের ভয় অনুভব করতে পারে। এখান থেকে মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
আবেগী মানসিক যন্ত্রণাঃ
কিছু মানুষ মানসিক রোগ বা মানসিক সমস্যায় ভুগে। এই রোগ বা সমস্যার সমাধান করতে অনেকেই কাউন্সিলিং বা থেরাপি নেয় না। এর ফলে মানসিক সমস্যা বা রোগ তাদের মধ্যে থেকে যায়। ফলে মানসিক সমস্যা থেকে শারীরিক উপসর্গগুলো বিকাশিত হতে থাকে। আর এই রোগগুলো থেকে ধীরে ধীরে তারা সাইকোসোমাটিক ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হতে পারে।
যেমন: যদি কোনো ব্যক্তি আপনজন বা প্রিয়জন দ্বারা প্রত্যাখ্যাত বোধ করে তখন তার শরীর কার্টিসল এবং অ্যাড্রোনালিনের মতো স্বাভাবিক মাত্রার স্ট্রেস হরমোন নিসৃত হতে থাকে। এর প্রভাবে অসুস্থতা না থাকা সত্ত্বেও উচ্চ রক্তচাপ, হার্টে পর্যাপ্ত রক্ত সঞ্চালন না হওয়াসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে থাকে।
সাইকোসোমেটিক ডিসঅর্ডারের কোনো একক কারণ নেই৷ তবে মানসিক এবং শারীরিক সমস্যার সংমিশ্রণে এই ডিসঅর্ডারগুলো সৃষ্টি হয় বলে মনে করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় কোনো ব্যক্তির যদি বিষণ্ণতা বা উদ্বেগের ইতিহাস থেকে থাকে তবে সেই সকল ব্যক্তি সেই উদ্বেগ বা বিষণ্ণতা থেকে ধীরে ধীরে এই ব্যাধি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
স্ট্রেসপূর্ণ বা মানসিক কষ্ট দেয় এমন ঘটনা, যেমন হঠাৎ প্রিয়জনের মৃত্যু, চোখের সামনে বড় দুর্ঘটনা, সহ্য হয় না এমন ভায়োলেন্স চোখের সামনে দেখা ইত্যাদি এই ধরণের অসুখের ট্রিগার হতে পারে।
সাইকোসোমাটিক ডিসঅর্ডারের ধরণঃ
সাইকোসোমাটিক ডিসঅর্ডার বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। এসকল ধরণের মধ্যে রয়েছে-
★ ডিপ্রেসিভ ব্যাধিঃ
এই ধরণের সাইকোসোমাটিক বিষণ্ণতা আচরণ এবং মেজাজের বিরুপ পরিবর্তন ঘটায়। যে পরিবর্তন আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক এবং মানসিক অনুভবকে প্রভাবিত করতে পারে। বিষণ্ণতার ফলে ঘুমের ধরণ, ক্ষুধা, শক্তির মাত্রা, প্রেরণা এবং স্মৃতিশক্তিতে পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকে।
চিকিৎসা করানো না হলে এই ধরণের সাইকোসোমাটিক রোগীর মানসিক সমস্যার পাশাপাশি শারীরিক জটিল কিছু রোগ যেমন: উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিস হতে পারে।
★ উদ্বেগ ব্যাধিঃ
উদ্বেগজনিত রোগগুলোর মধ্যে অস্বস্তির অনুভূতি জড়িত। আর এই অস্বস্তি এক পর্যায়ে কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে চলতে পারে। এই অস্বস্তিদায়ক অনুভূতিগুলো এমন পরিস্থিতি বা পরিস্থিতির প্রক্রিয়া তৈরি করতে পারে যা আসলে কখনোই ঘটা সম্ভব না। যেমন- নানা রকম ফোবিয়া।
আবার উদ্বেগজনিত রোগগুলো প্রায়ই হতাশার সাথে জড়িত থাকে। কারণ উদ্বেগ এবং হতাশার লক্ষণগুলো একই রকম। যেমন খিটখিটে ভাব এবং মেজাজ গরম হয়ে যাওয়া।
★ সোমাটাইজেশন ডিসঅর্ডারঃ
সোমাটাইজেশন ডিজঅর্ডার হচ্ছে এক ধরনের মানসিক রোগ, যা মানসিক সমস্যার পাশাপাশি শারীরিক বেশ কিছু উপসর্গ সৃষ্টি করে। আর শারীরিক এই উপসর্গগুলো মারাত্মক আকার ধারন করতে পারে। এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করতে পারে।
যদিও সোমাটাইজেশন ডিসঅর্ডারের কোনো প্রতিকার নেই। তবে কিছু চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর মাঝে দেখা দেওয়া লক্ষণগুলোর প্রভাব কমিয়ে আনার পাশাপাশি জীবন যাপনের মান উন্নত করা যায়।
বিকল্প চিকিৎসাঃ
সাইকোসোমাটিক ডিসঅর্ডারের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই৷ তবে লক্ষণগুলো কমিয়ে আনতে বেশ কিছু বিকল্প চিকিৎসা রয়েছে। এসব চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে-
★ জীবনধারা পরিবর্তনঃ
জীবন-যাপনে বেশ কিছু পরিবর্তন আনার মাধ্যমে সাইকোসোমাটিক ডিসঅর্ডারের লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। নিয়মিত ধ্যান বা মেডিটেশন করা, পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানো, নিয়মিত ব্যায়াম, খেলাধুলা করার পাশাপাশি ধুমপান, অ্যালকোহল, মাদক সেবন, অলস হয়ে বসে থাকা থেকে বিরত থেকে নিজেকে এই ধরনের রোগ থেকে নিরাপদে রাখা সম্ভব।
সাইকোসোমাটিক ডিজিজে আক্রান্ত রোগীর পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ করে এমন চিকিৎসক ও থেরাপিস্ট খুঁজে তার স্মরণাপন্ন হওয়াটা জরুরী। রোগীর চিকিৎসায় কিছু রোগীর ঔষধের প্রয়োজন হতে পারে। আবার কিছু রোগীর জন্য থেরাপির প্রয়োজন হতে। এই থেরাপি ফিজিক্যাল বা মেন্টাল অথবা উভয় থেরাপিই হতে পারে। মনে রাখতে হবে সাইকোসোমাটিক রোগে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় অবশ্যই একজন পেশাদার ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হতে হবে।
★ জ্ঞানীয় আচরণগত থেরাপিঃ
জ্ঞানীয় আচরণগত থেরাপি (CBT) হচ্ছে এক ধরনের সাইকোথেরারি, যা মানুষকে নেতিবাচক চিন্তাভাবনা এবং আচরণের ধরন পরিবর্তন করতে সহায়তা করে। রোগীকে CBT সাধারণত কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে দেওয়া হয়৷ একজন প্রফেশনাল থেরাপিস্টের স্মরণাপন্ন হয়ে তার পরামর্শে এই থেরাপি নিতে হয়।
★ এন্টিডিপ্রেসেন্ট ঔষধ:
এন্টিডিপ্রেসেন্ট ঔষধগুলো প্রধাণত বিষণ্ণতাজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োগ করা হয়। এই ধরণের ঔষধ সাইকোসোমাটিক ডিসঅর্ডার এবং বিষণ্ণতাজনিত রোগের চিকিৎসায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এন্টিডিপ্রেসেন্ট ঔষধ মস্তিষ্কে রাসায়নিক ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করে। এবং সাধারণত কমপক্ষে ৬ সপ্তাহ ধরে এই ঔষধ সেবন করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরিশেষেঃ
সাইকোসোমাটিক রোগ হচ্ছে সেই সকল রোগ, যা রোগীর মনে উপসর্গের উৎপত্তি ঘটায়। এই রোগগুলো মানসিক প্রক্রিয়া দ্বারা উৎপাদিত হয় এবং সেখান থেকে শারীরিক ব্যাধির সৃষ্টি করে। এই রোগগুলো সরাসরি শারীরিক ব্যাধি দ্বারা সৃষ্টি হয় না। এই রোগগুলো নির্ণয় করা বা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা চিকিৎসকের জন্য কঠিন হয়ে পরে। বিশেষ করে যখন এটি শুধুমাত্র মনস্তাত্ত্বিক রোগে সীমাবদ্ধ থাকে।
মনে রাখতে হবে এই রোগগুলোতে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা না করা বা উপেক্ষা করা উচিত নয়। কারণ এই রোগকে উপেক্ষা করলে রোগটি মানসিক সমস্যার পাশাপাশি শারীরিক সমস্যাকে মারাত্মক করে তুলতে সক্ষম।
আরও পড়ুনঃ সিজোফ্রেনিয়ার কয়টি লক্ষণ আছে আপনার মাঝে?
