আমাদের আশেপাশে অনেক সময় দেখা যায় দুর্ভাগ্যবশত অনেকের সন্তান প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম গ্রহণ করে, বা জন্মানোর পরে প্রতিবন্ধী হয়ে যায়। এই বিষয়টা যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত তেমনই দুর্ভাগ্যজনক। কারণ কোনো মানুষই চায় না তার সন্তান কোনো প্রকার ত্রুটি বা প্রতিবন্ধীকতা নিজে পৃথিবীতে আসুক। সময়ের সাথে সাথে আমাদের আশেপাশে এই প্রতিবন্ধী সন্তান জন্মানোর হার বেড়ে যাচ্ছে। যার ফলে সন্তান প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মাচ্ছে কেন, বা কি কারণে সন্তান প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নিচ্ছে এই বিষয়ে জানতে আগ্রহী হচ্ছে মানুষ।
সমাজে জন্ম নেওয়া এই সকল প্রতিবন্ধী সন্তান বা মানুষদের বাদ দিয়ে বা অবহেলায় রেখে সমাজে উন্নতি করা সম্ভব নয়।
এক সময় বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের পাগল হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং তাদের চিকিৎসা, শিক্ষা ও সুরক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো। আর শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে কোনো সন্তান জন্মালে বলা হতো পিতা-মাতার পাপের কারণে সন্তান এমন হয়েছে। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী সন্তান বা শারীরিক প্রতিবন্ধী সন্তানের প্রতিবন্ধকতা যেন অন্যদের কাছে প্রকাশ না পায়, সেজন্য তাদের বাহিরের পরিবেশ থেকে দূরে রাখতে ঘরবন্দি করে রাখা হতো। হতো বললে ভুল হবে, কারণ এখনো আমাদের দেশের অনেক গ্রাম সমাজে এমনটা করা হচ্ছে।
আর এই কারণে প্রতিবন্ধী শিশুগুলো আরও প্রতিবন্ধকতার মাঝে বেড়ে উঠতো বা উঠছে। এই ধরনের সন্তানদের পৈতৃক সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত করা হতো।
আমাদের গ্রাম্য সমাজে নারীরা এমনিতেই অবহেলিত। আর সেই নারী যদি প্রতিবন্ধী হয় তাহলে তার ভোগান্তির পর্যায় তো আরও চরম আকার ধারণ করে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো পরিবার এমনকি সমাজ দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় এই নারীরা।
একটু সচেতন হলে মানুষের এই প্রতিবন্ধকতা থেকে তাদের মুক্ত করা সম্ভব। শিশু জন্মানোর পরই যদি শিশুর প্রতিবন্ধকতা শনাক্ত করা যায়, তাহলে কার্যকর ব্যবস্থা এবং চিকিৎসার মাধ্যমে কিছু শিশুদের এই প্রতিবন্ধকতা থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
অটিজম বা প্রতিবন্ধী কী কারণে হয় এটি সুনির্দিষ্ট করে বলা খুবই কঠিন বা প্রায় অসম্ভব বলা যায়। তবে প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম নেওয়ার কিছু সাধারণ কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। বেশ কিছু কারণে শিশু আটিস্টিক বা প্রতিবন্ধী হতে পারে। এসব কারণের মধ্যে কিছু কারণ জেনেটিক আবার কিছু হতে পারে পারিপার্শ্বিক কারণে। যদি আমরা একটু সতর্ক বা সচেতন হতে পারি, এবং কিছু নিয়ম নীতি মেনে চলতে পারি তাহলেই আমাদের সন্তানদের প্রতিবন্ধী নামক অভিশাপ থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হবে। তাহলে আসুন জেনে নেই প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম নেওয়ার কিছু কারণ।
প্রতিবন্ধী শিশু জন্মানোর কারণঃ
সন্তান প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মানোর পিছনে যে সকল কারণকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে সেগুলো হচ্ছে-
১. গর্ভাবস্থায় অযাচিত ঔষধঃ
গর্ভবতী মা যদি ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই নানা প্রকার ঔষধ সেবন করতে থাকে, তাহলে তা গর্ভের শিশুর জন্য মারাত্মক হতে পারে। অনেক ঔষধ আছে যেগুলো ভ্রুণের অঙ্গ সৃষ্টিতে বাঁধা সৃষ্টি করে। এসব ঔষধ সেবনের ফলে সন্তান যে কোনো ধরনের বিকলঙ্গ বা প্রতিবন্ধীকতা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করতে পারে।
২. রক্তের গ্রুপঃ
যদি স্বামীর রক্ত পজেটিভ হয় এবং স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হয় এবং গর্ভের সন্তানের রক্তের গ্রুপ পজেটিভ হয়, তাহলে সন্তান জন্মানোর পর যত দ্রুত সম্ভব (৭২ ঘন্টার মধ্যে) মায়ের শরীরে Anti-D ইঞ্জেকশন পুশ করতে হবে। তা না হলে মায়ের শরীরে RhD পজেটিভ শিশুর রক্ত সংস্পর্শে এসে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে৷। ফলে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় এই অ্যান্টিবডিগুলো গর্ভের শিশুর লোহিত রক্তকণিকাকে আক্রমণ করতে পারে। এর প্রভাবে পরবর্তী সন্তান প্রতিবন্ধী হওয়া ছাড়াও সন্তানের জন্ডিস, অ্যানিমিয়া হতে পারে। এমনকি গর্ভপাত বা ভ্রুণের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। রক্তকণিকায় আক্রমণের এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় হিমোলাইটিক ডিজিজ অফ দ্যা ফিটাস এন্ড নিউবর্ন। এটিকে আবার Rh incompatibility ও বলা হয়।
৩. গর্ভাবস্থার প্রথমে কিছু রোগাক্রান্ত হলেঃ
গর্ভাবস্থার প্রথম ৩ মাসে গর্ভবতী না যদি যক্ষ্মা, এইডস, মাম্পস, টায়ফয়েড, ম্যালেরিয়া, চিকেনপক্স, রুবেলা ভাইরাস, জার্মানহাম ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়, তাহলে গর্ভের সন্তানের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে এবং এই প্রভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে থাকে। যার প্রভাবে সন্তান শারীরিক বিকলাঙ্গতা ছাড়াও মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে।
এসকল রোগ ছাড়াও গর্ভাবস্থায় মায়ের ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা ইত্যাদি থাকলে তা গর্ভের সন্তানের উপর প্রভাব ফেলে সন্তানকে প্রতিবন্ধী হিসেবে ভূমিষ্ট করতে পারে।
৪. গর্ভাবস্থায় খিঁচুনিঃ
যদি গর্ভবতী মায়ের ঘন ঘন খিঁচুনি হয়, তাহলে গর্ভের শিশুর অক্সিজেনের অভাব ঘটতে পারে। যার প্রভাবে সন্তান মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারে বলে গবেষণায় পাওয়া যায়।
৫. গর্ভধারণের বয়সঃ
গর্ভবতী মায়ের বয়স যদি খুব কম (১৪-১৫ বা তার কম) এবং খুব বেশি অর্থাৎ ৪০ এর বেশি হয় তাহলে সন্তান প্রতিবন্ধী হওয়ার এক ধরনের ঝুঁকি থাকে।
৬. জন্মের সময় মাথায় আঘাতঃ
জন্মের সময় শিশুর মাথায় জোরে আঘাত পেলে সেই শিশু প্রতিবন্ধী হতে পারে। সাধারণত বাসায় দাঈমা দিয়ে সন্তান প্রসব করানোর সময় এমন আঘাতের হার বেশি হয়ে থাকে। আবার ছোট বেলায় পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেলেও সন্তান পরবর্তীতে মানসিক বা শারীরিক প্রতিবন্ধী হতে পারে।
৭. মায়ের উচ্চতা ও স্বাস্থ্যঃ
গর্ভবতী মায়ের উচ্চতা যদি সাড়ে ৪ ফুটের কম এবং সেই সাথে মায়ের স্বাস্থ্য কম বা খুব পাতলা হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রেও সন্তান প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম গ্রহণ করতে পারে।
প্রতিকারঃ
উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম কি কি কারণে প্রতিবন্ধী সন্তান জন্মগ্রহণ করতে পারে। সন্তান যেন প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মগ্রহণ না করে সেজন্য আমাদের বেশ কিছু কাজ করতে হবে। আর সেগুলো হচ্ছে-
১. গর্ভাবস্থায় নানা জটিলতায় সন্তানের অটিজম হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই গর্ভাবস্থায় নারীকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। এসময় মায়েদের সুষম খাবার, মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়ক নানা ধরনের ভিটামিন ও মিনারেলস যেমন: ফলিক এসিড, আয়রন সেবন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। এবং কমপক্ষে ৪ বার শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে মায়ের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি গর্ভের সন্তানের অটিজম হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা তা জানা ও বহুলাংশে কমানো সম্ভব।
২. প্রতিবন্ধকতা রোধ করতে হলে গর্ভকালীন সময়ে ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত ঔষধ সেবনে বিরত থাকতে হবে।
৩. প্রতিষেধক টিকা গ্রহণ করতে হবে এবং জন্মের পর শিশুকে পর্যাপ্ত মায়ের দুধ পান এবং ৬ মাস পর থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থকর ও সুন্দর পরিবেশে সন্তানকে লালন-পালন করতে হবে।
৪. খুব অল্প বয়সে বা অধিক বয়সে সন্তান গর্ভধারণ রোধ করতে হবে। ২০-২৬ বছরের মধ্যে প্রথম সন্তান নেওয়া মা ও সন্তান উভয়ের জন্য নিরাপদ।
৫. যদি স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হয়ে থাকে, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা বা সন্তান জন্ম নেওয়ার ৭২ ঘন্টার মধ্যে Anti RhD টিকা নিয়ে নিতে হবে। এমনকি গর্ভপাত হলেও ৭২ ঘন্টার মধ্যে টিকা নিতে হবে।
৬. প্রতিবন্ধী সন্তান বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারীর অধিকার, চলাচল, পড়ালেখার অধিকার, সরকারি সেবা প্রাপ্তির অধিকার, শিশু অধিকার, স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামোতে অংশগ্রহণ, প্রবেশগম্যতার অধিকার, কাজের অধিকার, স্বাস্থ্য সেবার অধিকার, সংগঠিত হওয়ার অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের অধিকার ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুনঃ গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিডের অভাবে হতে পারে সন্তানের মৃত্যুও।
