হেমোলাইটিক এনিমিয়া হচ্ছে এমন এক রোগ, যা লোহিত রক্ত কণিকা পূর্ণতা পাওয়ার আগে ধ্বংস হওয়ার ফলে ব্লিডিং বা রক্ত প্রবাহ হওয়া হওয়াকে বুঝায়। এই রোগটি বিভিন্ন উপসর্গের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। এবং কার্যকরভাবে নির্ণয় এবং চিকিৎসার জন্য নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ জরুরী।
হেমোলাইটিক এনিমিয়া কিঃ
যখন লোহিত রক্তকণিকা বোনম্যারো বা অস্থিমজ্জা দ্বারা উৎপন্ন হওয়ার আগেই দ্রুত ধ্বংস হয়ে যায় তখন একে হেমোলাইটিক এনিমিয়া বলা হয়। লোহিত রক্তকণিকার কোষের এই ভারসাম্যহীনতা রক্তের ঘাটতির দিকে ধাবিত কর। ফলে সারা শরীরে অক্সিজেন পরিবহন বা সরবরাহে বিরুপ প্রভাব পড়ে। লোহিত রক্তকণিকার ধ্বংস বা ঘাটতি ইন্ট্রাভাসকুলার (রক্তনালীর ভিতরে) বা এক্সট্রাভাসকুলার (রক্তনালীর বাহিরে) আকারে হতে পারে।
কারণঃ
অসংখ্য কারণে হেমোলাইটিক এনিমিয়া হতে পারে। এই সকল কারণকে বিস্তৃতভাবে অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক ফ্যাক্টর এই দুই ভাগে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়ে থাকে।
অভ্যন্তরীণ কারণঃ
অভ্যন্তরীণ কারণগুলো লোহিত রক্ত কণিকায় অন্তর্নিহিত ত্রুটি সমূহের সাথে জড়িত। এই ত্রুটিগুলো জেনেটিক কারণে বা অর্জিত কারণে হতে পারে। অভ্যন্তরীণ কারণগুলোর মধ্যে সাধারণত রয়েছে-
বংশগত স্ফেরোসাইটোসিসঃ
বংশগত স্ফোরোসাইটোসিস হচ্ছে একটি জেনেটিক ডিজঅর্ডার, যার প্রভাবে লোহিত রক্তকণিকাগুলো ডিস্ক আকৃতির পরিবর্তে গোলাকার হয়। আর এই আকারের কারণে রক্ত কণিকাগুলো ফেঁটে বা ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
G6PD এর অভাবঃ
G6PD এর অভাব বলতে এনজাইম গ্লুকোজ-6-ফসফেট ডিহাইড্রোজেনেসের এক প্রকার জেনেটিক ঘাটতিকে বুঝায়। যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের প্রভাবে লোহিত রক্ত কণিকাকে দুর্বলতার দিকে ধাবিত করে।
সিকেল সেল এনিমিয়াঃ
এটিও এক ধরনের জেনেটিক ডিসঅর্ডার। যার প্রভাবে লোহিত রক্ত কণিকাগুলো অস্বাভাবিক আকারে গঠিত হয়, এবং হেমোলাইসিসের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
★ বাহ্যিক কারণসমূহঃ
বাহ্যিক কারণগুলোর জন্য বাহ্যিক কিছু উপাদান জড়িত। এই উপাদানগুলো রেড ব্লাড সেল বা লাল রক্ত কোষের ধ্বংস ঘটায়। এই সকল বাহ্যিক উপাদানের মধ্যে থাকতে পারে–
অটোইমিউন হেমোলাইটিক এনিমিয়াঃ
ইমিউন সিস্টেম ভুলভাবে লাল রক্ত কণিকাকে আক্রমণ করে ক্ষতিগ্রস্থ বা ধ্বংস করে থাকে। AIHA বা অটোইমিউন হেমোলাইটিক এনিমিয়া ইডিওপ্যাথিক বা লুপাসের মতো রোগ সৃষ্টি করতে পারে। যার ফলে হতে পারে লিম্ফোমাস।
সংক্রমণঃ
কিছু সংক্রমণের কারণে হেমোলাইসিস হতে পারে। এসব সংক্রমণের মধ্যে থাকতে পারে ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, বেবিওসিস ইত্যাদি। এছাড়াও কিছু ভাইরাস যেমন- হেপাটাইটিস, EBV, সেপসিস বা তীব্র ব্যাকটেরিয়া জনিত সংক্রমণ এই রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
মেডিকেশনঃ
কিছু ঔষধ ইমিউন মেকানিজম বা সাইড এফেক্টের প্রভাবে সরাসরি রোহিত রক্ত কণিকাকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। আর সেখান থেকেই ঔষধগুলো হেমোলাইসিসকে প্ররোচিত করতে পারে।
যান্ত্রিক কারণঃ
যান্ত্রিক কিছু কারণ, যেমন হার্টের ভালভ প্রতিস্থাপন, কিডনি প্রতিস্থাপন, লিভার প্রতিস্থাপন, পেস মেকার স্থাপন ইত্যাদির প্রভাবে লোহির রক্ত কনিকা বা কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে। যার প্রভাবে হেমোলাইসিস হতে পারে।
লক্ষণঃ
হেমোলাইটিক এনিমিয়ার লক্ষণগুলো অবস্থার তীব্রতা এবং অন্তর্নিহিত কারণের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। এই পরিবর্তন ব্যাপক আকারে পরিবর্তিত হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. ক্লান্তিঃ রক্তে অক্সিজেনের পরিবহন ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ক্লান্তি অনুভব হবে।
২. গাঢ় প্রস্রাবঃ হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার কারণে বা লোহিত রক্ত কণিকা ভেঙে যাওয়ার কারণে গাঢ় প্রস্রাব হবে।
৩. নিঃশ্বাসে দুর্বলতাঃ রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবে।
৪. নেবা/জন্ডিসঃ বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে ত্বক এবং চোখ হলুদ হয়ে যাবে। লোহিত রক্ত কণিকা ভাঙ্গনের ফলে এমনটা হয়ে থাকে।
৫. দ্রুত হার্ট রেটঃ শরীরে বা রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকায় হার্ট শরীরে অধিক অক্সিজেন সরবরাহের চেষ্টা করবে। আর যার ফলে হার্ট রেট বেড়ে যাবে।
৬. ফ্যাকাশে ত্বকঃ এই রোগে আক্রান্ত হলে ত্বক অস্বাভাবিকভাবে ফ্যাকাশে হয়ে যাবে। সাথে চোখও ফ্যাকাশে দেখাতে পারে।
রোগ নির্ণয়ঃ
হেমোলাইটিক এনিমিয়া নির্ণয়ের জন্য রোগীর চিকিৎসার ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং ল্যাব টেস্টের সংমিশ্রণ জরুরী। রোগ নির্ণয়ে নিন্মের পদক্ষেপগুলো সাধারণত গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
চিকিৎসার ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষাঃ
চিকিৎসার পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস জানার মাধ্যমে হেমোলাইটিক এনিমিয়ার সম্ভাব্য কারণ বা ঝুঁকির কারণ কি কি তা নির্ণয় করা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি কিছু শারীরিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে একজন একজন চিকিৎসক রোগীর জন্ডিস, প্লীহা বেড়ে যাওয়া এবং ফ্যাকাশে ত্বকের মতো লক্ষণগুলো আছে কিনা তা নির্ণয় করবে।
ল্যাব টেস্টঃ
বেশ কিছু ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে হেমোলাইটিক এনিমিয়ার কারণ এবং রোগ নির্ণয় করা সম্ভব। এসব টেস্টের মধ্যে থাকতে পারে-
→কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (CBC):
লোহিত রক্ত কণিকার মাত্রা পরিমাপ করে লাল শোণিত কণার রঁজক উপাদান এবং রক্তের অন্যান্য উপাদান নির্ণয় করা যায়।
→ডিরেক্ট এন্টিগ্লোবুলিন টেস্ট (DTA):
কুম্বস বা Coombs পরীক্ষা নামেও এই টেস্টটি পরিচিত। এই টেস্টের মাধ্যমে লোহিত রক্ত কণিকার সাথে আবদ্ধ এন্টিবডি শনাক্ত করে, যা অটোইমিউন হেমোলাইটিক নির্ণয়ের জন্য জরুরী।
→ পেরিফেরাল ব্লাড স্মিয়ারঃ
এই টেস্টের দ্বারা একটি মাইক্রোস্কোপের অধীনে রেড ব্লাড সেলের আকৃতি এবং চেহারা পরীক্ষা করা হয়।
→ ল্যাকটেট ডিহাইড্রোজেনেস (LDH) স্তরঃ
উচ্চ পর্যায়ের হেমোলাইসিসের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষাটি করা হয়।
→ বিলিরুবিনের মাত্রাঃ
রক্তে বা লিভারে বিলিরুবিনের মাত্রা কতটা তা জানতে ব্লাড স্যাম্পল কালেকশন করা হয়। লোহিত রক্ত কণিকার ভাঙ্গনের কারণে হেমোলাইটিক এনিমিয়া বৃদ্ধি পায়।
→ রেটিকুলোসাইট গণনাঃ
এই পরীক্ষা রক্ত প্রবাহে নতুন লাল রক্ত কোষের (Red Blood Cell) সংখ্যা মূল্যায়ন করে। যা বোনম্যারো অর্থাৎ অস্থি মজ্জার কার্যকলাপ সম্পর্কে জানা যায়।
চিকিৎসাঃ
হেমোলাইটিক এনিমিয়ার চিকিৎসা রোগটির অন্তর্নিহিত কারণগুলোর উপর নির্ভর করে। আর কারণগুলোর উপর ভিত্তি করে যে সকল চিকিৎসার কৌশল অবলম্বন করা হতে পারে সেগুলো হচ্ছে-
১. মেডিকেশনঃ
Corticosteroids: এই ধরণের মেডিকেশন মূলত অটোইমিউন হেমোলাইটিক এনিমিয়ার ক্ষেত্রে ইমিউন সিস্টেমকে দমন বা প্রতিরোধ করতে কাজ করে।
ইমিউনোসপ্রেসিভ ড্রাগসঃ কর্টিকোস্টেরয়েড মেডিকেশন কাজ না করলে ইমিউনোসপ্রেসিভ টাইপের ড্রাগস সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়।
ফলিক এসিড পরিপূরকঃ ফলিক এসিড প্রধানত লোহিত রক্ত কণিকা উৎপাদন বা তৈরি হতে সহায়তা করে। তাই লোহিত রক্ত কণিকা বৃদ্ধি করতে ফলিক এসিড জাতীয় খাবার এবং ঔষধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়।
এন্টিবায়োটিকসঃ যদি কোনো ধরণের সংক্রমকের প্রভাবে হেমোলাইসিস হয়ে থাকে, তাহলে সংক্রামক এবং হেমোলাইটিক প্রতিরোধে কিছু এন্টিবায়োটিক সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়।
২. রক্ত সংক্রমণঃ
গুরুতর পর্যায়ে রক্তের লোহিত কণিকার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধির জন্য রক্ত বা প্লাটিলেট গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে রক্ত পরিবর্তন বা কিছু রক্ত শরীর থেকে ফেলে দিয়ে নতুন রক্ত নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হতে পারে। রোগের অন্তর্নিহিত কারণ নির্ণয় করার ক্ষেত্রে প্রায়ই এই ধরনের অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে।
৩. Splenectomy:
স্প্লেনেক্টমি হচ্ছে এক ধরনের সার্জারী। প্লীহা সাধারণত লাল রক্ত কণিকা ধ্বংস করার কাজ করে থাকে। যখন প্লীহা হেমোলাইসিসে আক্রান্ত হয় তখন অস্ত্রপাচারের মাধ্যমে প্লীহার কিছু অংশ অপসারণ করার সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
৪. অন্তর্নিহিত অবস্থার চিকিৎসাঃ
যদি অন্য কোনো কারণের জন্য হেমোলাইটিক এনিমিয়া সৃষ্টি হয়, তাহলে প্রাথমিক পর্যায়েই চিকিৎসা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, যদি অটোইমিউন ডিসঅর্ডার হয়ে থাকে বা রক্ত স্বল্পতার সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে রোগগুলোর চিকিৎসা করে এই রোগগুলোর সমাধান করে হেমোলাইটিকের সমাধান হতে পারে।
করণীয়ঃ
হেমোলাইটিক এনিমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের নিরাপদ থাকতে নিয়মিত ফলো-আপ এবং জীবন-যাত্রার মান উন্নত রাখা জরুরী। এক্ষেত্রে রোগী এবং রোগীর পরিবারের কিছু কাজ করা উচিত। আর সেগুলো হচ্ছে-
→ লক্ষণসমূহ পর্যবেক্ষণঃ
রোগীর মাঝে এই রোগের লক্ষণগুলো পরিলক্ষিত বা পরিবর্তন হচ্ছে কিনা সেদিকে নজর রাখতে হবে। যদি কোনো রকম দেখা যায় দ্রুত ডাক্তারকে অবহিত করতে হবে।
→ ট্রিগার এড়িয়ে চলুনঃ
নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ এবং কিছু সংক্রমণ হেমোলাইসিসকে ট্রিগার করতে পারে। তাই এই ধরণের ঔষধ বা সংক্রমণ সনাক্ত করে এগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে।
→ স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণঃ
প্রয়োজনীয় পুষ্টি প্রদান করে এসব খাবার গ্রহণ করতে হবে এবং পুষ্টির পরিমাণ নিশ্চিত করুন। বিশেষ করে লোহিত রক্ত কণিকার মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে কচু, কচুশাক, কলিজা, ডিম ইত্যাদি আয়রন জাতীয় খাবারের পাশাপাশি ফলিক এসিড যুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে।
→ হাইড্রেড থাকাঃ
পর্যাত পরিমাণে পানী বা পানীয় পান করে সঠিক হাইড্রেশন দেহের সামগ্রিক স্বাস্থ্য বজায় রাখে। পাশাপাশি সংবহনতন্ত্রকেও স্বাভাবিক রাখতে পারে।
মনে রাখবেন প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। আর সচেতন থাকার থেকে উত্তম প্রতিরোধ আর কিছু নেই।
আরও পড়ুনঃ
