হার্পিস সিমপ্লেক্স: এক ভয়াবহ সংক্রামক রোগ

হার্পিস সিমপ্লেক্সঃ

হারপিস সিমপ্লেক্স হচ্ছে একটি ভাইরাল সংক্রমণ জনিত রোগ, যা হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস (HSV) দ্বারা সৃষ্ট। এই রোগটি অত্যন্ত সংক্রমক। সংক্রমিত ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ট যোগাযোগের মাধ্যমে, বিশেষ করে মৌখিক বা যৌনাঙ্গের ক্ষরণের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে ছড়াতে পারে। এই ভাইরাস একবার কারো শরীরে প্রবেশ করলে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত স্নায়ু কোষে সুপ্ত থাকতে পারে। এবং পর্যায়ক্রমে বারবার ভাইরাসটি সক্রিয় হতে পারে। যার কারণে উপসর্গগুলো শরীরে পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

ধরণঃ

হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস প্রধান ধরণ দুইটি।এই দুইটি প্রধান ধরনের ভাইরাস হচ্ছে HSV-1 এবং HSV-2 ভাইরাস। HSV-1 ভাইরাস সাধারণত ওরাল হার্পিস। অর্থাৎ মুখে ঘা এর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এর মধ্যে জ্বর ঠোসাও অন্তর্গত।  আর HSV-2 এর প্রধান কারণ যৌনাঙ্গের হার্পস। এই ধরণের হার্পিস হলে যৌনাঙ্গে ঘা, পুঁজ ইত্যাদির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তবে উভয় ধরনের ভাইরাসই মুখ বা যৌনাঙ্গে সংক্রমিত হতে পারে।

এছাড়াও আরও কিছু ধরণের হার্পিস সিমপ্লেক্স আছে। এগুলো হচ্ছে-

নবজাতকের হার্পিসঃ

নবজাতকের হার্পিস বিরল কিন্তু গুরত্বর একটি পর্যায়। গর্ভাবস্থায় নারীর হার্পিস থাকলে প্রসবের সময় HSV এর সংস্পর্শে আসলে বা হার্পিসে আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসলে নবজাতক হার্পিসে সিমপ্লেক্সে আক্রান্ত হতে পারে। শিশু হার্পিসে আক্রান্ত হলে অন্ধত্ব এমনকি মৃত্যুর দিকে পর্যন্ত ধাবিত হতে পারে।

হার্পিস গ্ল্যাটিয়েটোরামঃ

হার্পিস গ্ল্যাডিয়েটোরাম সাধারণত রেসলারের হার্পিস নামে পরিচিত। HSV-1 দ্বারা সৃষ্ট এবং আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বকে সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে এই ধরণের ভাইরাসটি অন্যের শরীরে ছড়িয়ে পরে।

হার্পিস হুইটলোঃ

হার্পিস হুইটলো হচ্ছে এমন ধরণের হার্পিস যা আক্রান্ত ব্যক্তির আঙ্গুলগুলোকে আক্রান্ত করে। এই ধরনের হার্পিস প্রায়শই স্বাস্থসেবা কর্মী বা আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়।
হার্পিস সিনপ্লেক্সের কোনো নিরাময় নেই। তবে উপসর্গ এবং এর প্রাদুর্ভাবের ফ্রিকুয়েন্সি কমাতে বেশ কিছু চিকিৎসা রয়েছে। হার্পিস সিমপ্লেক্স থেকে বেঁচে থাকতে হলে নিরাপদ যৌনতা অনুশীলন করা অপরিহার্য।

হার্পিস সিমপ্লেক্সের লক্ষণঃ

যখন কোনো ব্যক্তি হার্পিস সিমপ্লেক্সে আক্রান্ত হয়, তখন লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগে সে ব্যথা অনুভব করতে পারে। মুখ, ঠোঁট বা যৌনাঙ্গে ঘা বা ফোসকা দেখা দিতে পারে। এই ফোসকাগুলোর সাথে চুলকানি, জ্বলন্ত সংবেদন বা টিংলিং হতে পারে। এসব লক্ষণের পাশাপাশি কিছু রোগীর শরীরে ফ্লু এর মত উপসর্গ যেমন জ্বর, মাথাব্যথা এবং প্রাদুর্ভাবের সময় ফোলা লিম্ফ নোড দেখা দিতে পারে।

যৌনাঙ্গে বা মুখে বেদনাদায়ক ফোসকা বা ঘা হার্পিস সিমপ্লেক্সের প্রথম ও সাধারণ লক্ষণ।
প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত করা গেলে এবং কার্যকর চিকিৎসা নেওয়া গেলে এই রোগের প্রাদুর্ভাবের ফ্রিকোয়েন্সি কমানো সম্ভব হয়। সঠিক রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা পেতে কোনো ব্যক্তির হার্পিস সিমপ্লেক্স আছে কি না জানতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বিকল্প নেই।
হার্পিস সিমপ্লেক্সে ফোসকা বা ঘা দেখা দেওয়ার আগে আক্রান্ত স্থানে চুলকানি, ঝিঁঝিঁ করা বা জ্বালাপোড়া হতে পারে।

শরীর ব্যথা, জ্বর এবং মাথাব্যথার মত লক্ষণগুলো হার্পিস সিমপ্লেক্সের প্রাদুর্ভাবের কারণে হতে পারে।
কুঁচকি ঘাড়ের আশেপাশে ফোলা লিম্ফ নোড হার্পিস সিমপ্লেক্সের একটি অন্যতম লক্ষণ।
যদি যৌনাঙ্গে হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রস্রাব করার সময় ব্যথা, জ্বালা বা অন্যান্য অসুবিধা বোধ করতে পারে।

হার্পিস সিমপ্লেক্সের কারণঃ

আগেই উল্লেখ্য করেছি HSV এর দুটি প্রধান রয়েছে। যার একটি HSV-1 এবং অপরটি HSV-2 টাইপ৷ HSV-1 টাইপ মৌখিক হার্পিসের সাথে যুক্ত। এর প্রভাবে মূলত মুখে বা ঠোঁটে জ্বর ঠোসা, ফোসকা বা ঘা সৃষ্টি হয়। আর HSV-2 টাইপ সাধারণত যৌনাঙ্গের হার্পিসের সাথে যুক্ত। ভাইরাসটির উভয় টাইপই সংক্রমিত ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক যেমন চুম্বন, যৌন সম্পর্ক ইত্যাদির কারণে অন্য ব্যক্তিদের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও আক্রান্ত ব্যক্তির লালা, শ্লেষ্মা ঝিল্লি বা ত্বকের সংস্পর্শের মাধ্যমেও অপরের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

যদি কারো শরীরে ভাইরাসটি একবার প্রবেশ করে, তাহলে এটি দীর্ঘদিন স্নায়ুকোষে সুপ্ত থাকে। এবং পরবর্তীতে স্ট্রেস, অসুস্থতা বা দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থার মতো কারণে ট্রিগার হলে আবার লক্ষণগুলো শরীরে প্রকাশ পেয়ে থাকে।
হার্পিস সিমপ্লেক্সে আক্রান্ত হতে পারে এমন কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অরক্ষিত যৌন কার্যকলাপে জড়িত হওয়া এবং দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থা। মূলত যৌনাঙ্গে থাকা জীবাণু, শুক্রাণু বা ডিম্বাণু গলায় বা পেটে প্রবেশের ফলে এই ভাইরাসে আক্রান্তের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বলে গবেষণায় জানা যায়।
ক্লান্তি, স্ট্রেস, অসুস্থতা, কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং কিছু ঔষধ সেবনের সাইড ইফেক্ট আক্রান্ত ব্যক্তিদের হার্পিস সিমপ্লেক্সের প্রাদুর্ভাবকে ট্রিগার করতে পারে।

গর্ভাবস্থায় হার্পিস থাকলে গর্ভবতী মায়ের দ্বারা নবজাতকও এই রোগে আক্রান্ত করতে পারে। এবং নবজাতকের সংক্রমণকে জটিলতার দিকে ধাবিত করে।

ঝুঁকির কারণঃ

হার্পিস সিমপ্লেক্স একটি ভাইরাল সংক্রমণ। আর এই ভাইরাসের আক্রান্ত হওয়ার বেশ কিছু ঝুঁকির কারণ রয়েছে।
এই সংক্রমণের প্রাথমিক মোড হলো কোনো সংক্রমিত ব্যক্তি বা তাদের ক্ষরণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন। এছাড়া অরক্ষিত যৌন মিলন বা যৌন কার্যকলাপে জড়িত হলে হার্পিস সিমপ্লেক্সে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। পাশাপাশি একাধিক যৌন সঙ্গী থাকা, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, জোর এবং একটি সক্রিয় ক্ষতযুক্ত চামড়ার সাথে চামড়ার যোগাযোগ।

জ্বর ঠোসা মূলত হার্পিস ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। জ্বর ঠোসা আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে একই পাত্রে খাওয়া বা একই গ্লাসে বা কাপে পানীয় পান করলে হার্পিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। জ্বর ঠোসা থাকা অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তির থালা, বাসন, গ্লাস, গামছা ইত্যাদি আলাদা রাখাই শ্রেয়।
সংক্রমিত ব্যক্তির সাথে অরক্ষিত যৌন কার্যকলাপ হার্পিস সিমপ্লেক্সে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

আবার পূর্ববর্তী হার্পিস সিমপ্লেক্স সংক্রমণ বা অন্যান্য যৌন সংক্রমণে আক্রান্ত থাকার ইতিহাস থাকলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই ভাইরাস সংক্রমণের আক্রান্ত হওয়া বা সম্ভাবনা এড়াতে নিরাপদ যৌনতা অনুশীলন এবং সুস্থ স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
HIV/AIDS এর মতো রোগে আক্রান্ত হলে আক্রান্ত ব্যক্তির ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে যায়। আর এর ফলে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হার্পিস সিমপ্লেক্সে আক্রান্ত হতে সংবেদনশীল করতে পারে।

মুখ বা যৌনাঙ্গে সক্রিয় হার্পিস ক্ষতগুলোর সাথে ত্বক থেকে ত্বকের যোগাযোগ এক ব্যক্তি থেকে অপর ব্যক্তিতে ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এছাড়া স্ট্রেস এবং ক্লান্তি ইতিমধ্যে ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত ব্যক্তিদের মধ্যে হার্পিসের প্রাদুর্ভাবকে ট্রিগার করতে সক্ষম।

রোগ নির্ণয়ঃ

হার্পিস সিমপ্লেক্স নির্ণয় করার জন্য চিকিৎসক ব্যক্তির উপসর্গগুলো মূল্যায়ন করবেন। অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তির বেদনাদায়ক ফোস্কা, মুখের চারপাশ এবং যৌনাঙ্গের ঘা পর্যবেক্ষণ করবেন।
পাশাপাশি রোগীর যৌন ইতিহাস বা আগে ঠান্ডা কালশিটে প্রাদুর্ভাব হয়েছিল কি না সে সম্পর্কে জানতে চাইবেন। এসব বিষয় পর্যালোচনা করে আক্রান্ত ব্যক্তির ভাইরাল কালচার, এন্টিবডি এবং পলিমারেজ চেইন রিয়্যাকশন (PCR) টেস্ট করার মাধ্যমে হার্পিস ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারেন। এই প্যাথলজিক্যাল টেস্টগুলোর মাধ্যমে চিকিৎসক রোগী HSV-1 নাকি HSV-2 টাইপ হার্পিস সিমপ্লেক্সে আক্রান্ত তা নির্ণয় করবেন। এবং নির্ণয়ের পরে কার্যকরী চিকিৎসা নির্ধারণ করবেন।

মূলত ভাইরাল কালচার বা পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (PCR) পরীক্ষার মাধ্যমে হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যায়।

ভাইরাসের বিরুদ্ধে এন্টিবডি সনাক্ত করার জন্য রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়। যা রোগীর অতীত বা বর্তমান সংক্রমণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিয়ে থাকে।
এছাড়া ডাইরেক্ট ফ্লুরোসেন্ট অ্যান্টিবডি (DFA) টেস্টিং ত্বকের ক্ষতগুলোতে ভাইরাল এন্টিজেন শনাক্ত করতে সহায়তা করে। এজন্য চিকিৎসক এই টেস্টের সুপারিশও করতে পারেন।

Tzanck স্মিয়ার টেস্ট, অর্থাৎ ফোস্কা থেকে কোষ নিয়ে মাইক্রোস্কোপের অধীনে পরীক্ষা করা হয়। এই টেস্টেও হার্পিস সিমপ্লেক্স সংক্রমণ নির্ণয় করতে সহায়তা করতে সক্ষম।
উপরোক্ত পরীক্ষা ব্যতীত কিছু ক্ষেত্রে হার্পিস সিমপ্লেক্স নির্ণয় নিশ্চিত করার জন্য ক্ষতের বায়োপসি করারও প্রয়োজন হতে পারে।

চিকিৎসাঃ

হার্পিস সিমপ্লেক্স নির্মুল করার কোনো চিকিৎসা এখনো আবিষ্কার করা যায়নি। তবে লক্ষণগুলোর প্রাদুর্ভাব হ্রাস করার জন্য বিকল্প কিছু চিকিৎসা প্রদান করা হয়। অর্থাৎ ফোস্কা, ঘা এগুলো নির্মূল এবং ব্যথা কমাতে কিছু মেডিসিন প্রদান করা হয়। অ্যান্টিভাইরাল ঔষধ যেমন, অ্যাসাইক্লোভির, ফেমসিক্লোভির এবং ভ্যালাসাইক্লোভির জাতীয় ঔষধ প্রাদুর্ভাব কমাতে এবং ব্যথা কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি ফোস্কা এবং ঘায়ের পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করার কাজও করে থাকে৷ এই ঔষধগুলো শরীরের মধ্যে ভাইরাসের প্রতিলিপিকে বাঁধা প্রদান করে থাকে।
অ্যান্টিভাইরাল ঔষধ ছাড়াও ব্যথা উপশমকারী টপিকাল ক্রিম এবং হট বাথ (উষ্ণ গোসল) ঘাগুলোর সাথে যুক্ত অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে।

প্রাদুর্ভাবের তীব্রতা এবং এর ফ্রিকোয়েন্সির উপর ভিত্তি করে সঠিক রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসা একমাত্র বিশেষজ্ঞ ডাক্তারই প্রদান করতে পারেন। এক্ষেত্রে নিজ ইচ্ছায় বা ফার্মেসীর কর্মীদের কথামত ঔষধ সেবন করা রোগীর জন্য এবং রোগীর আশেপাশের মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুনঃ জ্বর ঠোসা, অন্ধত্ব ও মৃত্যুর অন্যতম এক হাতিয়ার। 

Leave a Comment