প্যানক্রিয়াটাইটিস বা অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার কী

প্যানক্রিয়াটাইটিস বা অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারঃ

অগ্ন্যাশয়ের টিস্যুতে ক্যান্সারের কোষ বা কোষসমূহ সৃষ্টির ফলে যে ক্যান্সার সৃষ্টি হয় তাকে প্যানক্রিয়াটাইটিস বা অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার বলে।
অগ্ন্যাশয় হচ্ছে পেটের পিছনে অবস্থিত পেটের গহ্বরে উপস্থিত একটি অঙ্গ। এই অঙ্গটি অর্থাৎ অগ্ন্যাশয় পাচক রস, ইনস্যুলিন এবং অন্যান্য হরমোন সহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত করে। যা হজমে সহায়তা করে এবং রক্তে সুগার বা শর্করাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

প্যানক্রিয়াটাইটিস ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার সবচেয়ে কমন বা সাধারণ অংশ হচ্ছে টিউবের আস্তরণ, যা অগ্ন্যাশয় থেকে পাচকতন্ত্রে পাচক রস বহন ও সরবরাহ করে। তবে ক্যান্সার কোষগুলো অগ্ন্যাশয়ের যে কোনও অংশেই সৃষ্টি হতে পারে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, প্যানক্রিয়াটাইটিস ক্যান্সারের লক্ষণগুলো রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকাশ পায় না, বা রোগীরা বুঝতে পারে না। ক্যান্সার যখন শেষ পর্যায়ে থাকে এবং অগ্ন্যাশয় থেকে অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে তখন উপসর্গ অনুভব করে থাকে।
লাস্ট স্টেজ বা শেষ পর্যায়ে ক্যান্সারের চিকিৎসা করা অত্যন্ত কঠিন এবং এক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি প্রয়োগের প্রয়োজন হয়।

প্যানক্রিয়াটাইটিস ক্যান্সারের ধরনঃ

অগ্ন্যাশয় এন্ডোক্রাইন এবং এক্সোক্রাইন উভয় গ্রন্থি দ্বারা সৃষ্ট। যখন এক্সোক্রাইন গ্রন্থিগুলো একটি নালীর মাধ্যমে রাসায়নিক ক্ষরণ করে, তখন এন্ডোক্রাইন গ্রন্থিগুলো সরাসরি রক্তের প্রবাহে রাসায়নিকগুলো নিঃসরণ করে। অগ্ন্যাশয়ের অভ্যন্তরে ক্যান্সারের উৎসের উপর নির্ভর করে অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার দুই প্রকার।

১. এক্সোক্রাইন অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার,
২. এন্ডোক্রাইন অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার।

এক্সোক্রাইন অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারঃ
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য বেশিরভাগ প্যানক্রিয়াটাইটিস টিউমারই ক্যান্সার যুক্ত। এক্সোক্রাইন অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের বিভিন্ন ধরনের মধ্যে রয়েছে- জায়ান্ট সেল কার্সিনোমা, অ্যাকিনার সেল কার্সিনোমা এবং অ্যাডোনোসকোয়ামাস কার্সিনোমা।

এন্ডোক্রাইন অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারঃ
এই ধরনের প্যানক্রিয়াটাইটিস ক্যান্সার সাধারণ নয়। এই ধরনের ক্যান্সার কার্যকর (অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করে), আর অকার্যকর (হরমোন তৈরি করে না) এই প্রধান দুই ধরনে বিভক্ত। এন্ডোক্রাইন ক্যান্সারের প্রধান প্রকারগুলো হচ্ছে- সোমাটোস্ট্যাটিনোমাস, ইনসুলিনোমাস এবং গ্লুকাগনোমাস।

অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের লক্ষণঃ

আগেই বলেছি প্যানক্রিয়াটাইটিস ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী কোনো লক্ষণ বুঝতে পারে না। শেষ পর্যায়ে রোগীর শরীরে ক্যান্সারের লক্ষণগুলো অনুভব করে থাকে। যার ফলে রোগীর বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম এবং চিকিৎসা করার সময় তেমন পাওয়া যায় না।

কয়েকটি লক্ষণ দেখা দিলেও অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার হয়েছে চিকিৎসক এমনটা অনুমান করতে পারে না। কারণ লক্ষণগুলো অন্যান্য অন্তর্নিহিত রোগের কারণে হতে পারে। আর চিকিৎসক মূলত সেই সব রোগের জন্য মেডিকেল পরীক্ষা দিয়ে থাকেন। এবং সেখান থেকে এই প্যানক্রিয়াটাইটিস ক্যান্সারটি শনাক্ত হয়ে থাকে। প্যানক্রিয়াটাইটিস ক্যান্সারের কিছু লক্ষণের মধ্যে রয়েছে-

★ পেটে বা পিঠে ব্যথাঃ
অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের কারণে পেট বা পিঠে অথবা উভয় স্থানেই ব্যথা হতে পারে। ক্যান্সারের প্রভাবে অগ্ন্যাশয়ের আকার বৃদ্ধির কারণে অগ্ন্যাশয়ের আকার বৃদ্ধি পায়। যার ফলে আশেপাশের অঙ্গগুলোতে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। আর এই চাপের কারণেই পেটে বা পিঠে ব্যথা হতে পারে।

আবার অগ্ন্যাশয় বৃদ্ধির ফলে অগ্ন্যাশয়ের আশেপাশের নার্ভগুলোতে চাপ প্রয়োগ করে নার্ভগুলোকে সংকুচিত করে দিতে পারে। আর এর প্রভাবেও পেটে, পিঠে বা মাজায় ব্যথা হতে পারে।

★ বমি বমি ভাব এবং বমিঃ
অগ্ন্যাশয়ে ক্যান্সার হলে পাকস্থলীতেও সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। পাকস্থলীতে সমস্যা হওয়ার কারণে রোগীর বমি বমি ভাব এবং বমি হতে পারে। এছাড়া রোগীর পেটে ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে খাবার খাওয়ার সময় তীব্র ব্যথা অনুভব করে।

★ লিভার ও গলব্লাডার বৃদ্ধিঃ
অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের কারণে যকৃত (লিভার) এবং গলব্লাডার (পিত্তথলি) বড় হয়ে যেতে পারে। যখন ক্যান্সারের প্রভাবে পিত্তনালী ব্লক হয়ে যায়, তখন পিত্তথলিতে পিত্ত জমা হয়। ফলে গলব্লাডার বড় হয়ে যায়। আবার এই ক্যান্সার লিভারে ছড়িয়ে পড়লে লিভারও বড় হয়ে যেতে পারে।

★ জন্ডিসঃ
অগ্ন্যাশয়ের মাথা মূলত পিত্তনালীর কাছাকাছি থাকে। জন্ডিস যদি অগ্ন্যাশয়ের মাথায় শুরু হয়, তাহলে এটি অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ের লক্ষণ হতে পারে। আর অগ্ন্যাশয়ের লেজ বা শরীরে ক্যান্সার শুরু হলে প্যানক্রিয়াস ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ে জন্ডিস দেখা দিতে পারে।

অগ্ন্যাশয় বড় হয়ে গেলে পিত্তনালী সংকুচিত হয়ে যায়। যার ফলে পিত্তনালীর কার্যক্রমে বাঁধা সৃষ্টি হয়। যার ফলে শরীরে পিত্ত জমা হয় এবং বিলিরুবিনের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

★ ডায়াবেটিসঃ
অগ্ন্যাশয়ে ইনসুলিন নিঃসরণকারী কোষ থাকে। ক্যান্সার যখন এই কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তখন রোগীর মাঝে ডায়াবেটিসের লক্ষণ ফুটে উঠতে পারে। ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলোর মধ্যে থাকতে পারে ঘনঘন প্রস্রাব, ক্রমাগত ক্লান্তি, অধিক পিপাসা এবং ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া।

★ রক্ত জমাটঃ
অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াসের ক্যান্সারের কিছু ক্ষেত্রে পেটে বা পায়ে রক্ত জমাট বাঁধার মতো লক্ষণ দেখা দিয়ে থাকে। রক্ত জমাট বাঁধার এই ঘটনাকে ডিপ ভেইন বলা হয়।

কখনও কখনও জমাট বাঁধা রক্ত রক্ত ফুসফুসে পৌঁছে যেতে পারে, আবার ফুসফুসে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। যার ফলে ফুসফুসে ইনফেকশন এবং শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

★ ক্ষুধামন্দ্যঃ
অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্যালোরি বার্ণ হওয়ার পাশাপাশি পেশী প্রোটিন ভেঙে যায়। যার ফলে রোগীর ক্ষুধার পরিমাণ কমে যায়।

★ ওজন হ্রাসঃ
অন্যান্য ক্যান্সারের মতো প্যানক্রিয়াটাইটিস ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর অব্যক্ত ওজন হ্রাস পেয়ে থাকে।

★ দুর্বলতা ও ক্লান্তিঃ
এই ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী চরম ক্লান্তি অনুভব করে। যার ফলে অধিকাংশ সময় দুর্বল অনুভব হয়।

কখন ডাক্তার দেখাবেনঃ

প্রাথমিক পর্যায়ে অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে বা কোন সময় ডাক্তার দেখাতে হবে এটা বলা সম্ভব নয়। তবে শরীরে কিছু রোগ বা রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হওয়া জরুরী। এসব রোগ এবং লক্ষণের মধ্যে রয়েছে-

১. জন্ডিসের উপসর্গ বা ঘনঘন জন্ডিস হলে,

২. ক্রমাগত ক্লান্তি, বমি বমি ভাব এবং বমি হলে,

৩. অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে,

৪. যদি অন্য রোগের কারণে অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে।

অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের কারণঃ

একটি কোষের DNA সেই কোষের কার্যকারিতার সকল তথ্য ধারণ করে। এসকল তথ্যের মধ্যে একটি তথ্য হচ্ছে কখন কি হারে কোষ বিভাজন ঘটতে থাকে। এই DNA তথ্যের কিছু পরিবর্তন যা মিউটেশন হিসেবে পরিচিত, এই কোষটি অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হয়। যার ফলে কোষগুলো জমা হয়৷ কোষের এই জমা হওয়ার ফলে একটি টিউমার সৃষ্টি হয়। প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয়ের কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হলে সেখান থেকে প্যানক্রিয়াটাইটিস ক্যান্সার হয়। তবে কেন এই বিভাজন হয় সে সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য গবেষণায় এখনো পাওয়া যায়নি।

অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের ঝুঁকির কারণঃ

প্যানক্রিয়াটাইটিস ক্যান্সার কেন বা কি কারণে হয় সে সম্পর্কে স্পষ্ট বা সম্পূর্ণ ধারণা না থাকলেও কিছু কারণ এই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এই কারণগুলো হচ্ছে-

★ জেনেটিক রোগ, যেমন: লিঞ্চ সিনড্রোম।

★ কীটনাশক বা রঞ্জক জাতীয় রাসায়নিক পদার্থের এক্সপোজার।

★ লিভার সিরোসিস, জিনজিভাইটিস বা দীর্ঘস্থায়ী প্যানক্রিয়াটাইটিস চিকিৎসার সাইড এফেক্ট।

★ধূমপান, প্রতিদিন ব্যায়াম না করা বা অতিরিক্ত ওজন।

এই ক্যান্সারে নারীদের থেকে পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি।

চিকিৎসাঃ

প্যানক্রিয়াটাইটিস ক্যান্সারের চিকিৎসা রোগ কোন পর্যায়ে আছে তার উপর নির্ভর করে। মূলত প্রাথমিক পর্যায়ে এই ক্যান্সার ধরা পড়ে না বলে এই রোগের চিকিৎসা করা খুব কঠিন বা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে বিকল্প কিছু চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। বিকল্প চিকিৎসাগুলোর মধ্যে রয়েছে-

কেমোথেরাপিঃ
কেমোথেরাপির মাধ্যমে ক্যান্সার কোষকে ধ্বংস করা হয়। ক্যান্সার যখন প্যানক্রিয়াস থেকে অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে যায় মূলত তখন কেমোথেরাপির মাধ্যমে অন্যান্য অঙ্গের ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয়।

রেডিয়েশন থেরাপিঃ
উচ্চ শক্তির বিকিরণ ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষকে মেরে ফেলতে যে চিকিৎসা প্রদান করা হয় তাকে রেডিও থেরাপি বলা হয়। রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে ডাক্তারগণ কিছু রোগীর ক্ষেত্রে রেডিও থেরাপি প্রদানের নির্দেশ দিয়ে থাকেন। কিছু রোগীর জন্য অপারেশনের আগে আবার কিছু রোগীর অপারেশনের পরে রেডিয়েশন থেরাপি প্রদানের প্রয়োজন হয়।

সার্জারীঃ
টিউমার অপসারণের জন্য ডাক্তার অস্ত্রপাচার করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ডাক্তার সার্জারীর মাধ্যমে সম্পূর্ণ অগ্ন্যাশয় অপসারণ করে ফেলতে পারেন।

জটিলতাঃ
রোগ বৃদ্ধির সাথে সাথে প্যানক্রিয়াটাইটিস ক্যান্সারের বেশ কিছু জটিলতা দেখা দেয়। এইসব জটিলতাগুলো হচ্ছে-

* অন্ত্র বা পেটের সমস্যা,
* পেট বা পিঠে স্থির ব্যথা,
* জন্ডিস ও যকৃতের অন্যান্য রোগ,
* অতিরিক্ত হারে ওজন হ্রাস।

প্রতিরোধঃ
প্রতিটি রোগের প্রতিকারের থেকে প্রতিরোধ উত্তম। প্যানক্রিয়াটাইটিস ক্যান্সার থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে বা ঝুঁকি কমাতে নিন্মোক্ত কাজগুলো করা যেতে পারে।

১. স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা,
২. স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ,
৩. ধুমপান ও অ্যালকোহন এড়িয়ে চলা,
৪. রুটিন মাফিক ব্যায়াম করা।

পরিশেষে, প্যানক্রিয়াটাইটিস ক্যান্সার বা অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ প্রকাশ না করায় বা প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা না পড়ায় চিকিৎসা করা অত্যন্ত কঠিন। যদি কেউ এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন বা পরিবারে এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকে, তাহলে নিয়মিত ক্যান্সার স্কিনিং করা প্রয়োজন।

Leave a Comment