ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া হচ্ছে এক ধরনের ব্যথা জনিত রোগ যা ট্রাইজেমিনাল নার্ভের কার্যকারিতাকে ব্যহত করে মুখে তীব্র ব্যথার সৃষ্টি করে। এই রোগটি ডৌলোরেক্স নামেও পরিচিত। ট্রাইজেমিনাল নার্ভ এবং এর শাখাসমূহ মস্তিষ্কের সাথে মুখকে সংযুক্ত করে। এবং এই নার্ভ মুখের ভিতরে সহ কপাল থেকে চোয়াল পর্যন্ত স্পর্শ, তাপনাত্রা এবং চাপ সংবেদনের জন্য দায়ী।
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া মুখের মধ্যে তীব্র ব্যথা সৃষ্টি করে৷ যা মুখের ভিতরে শক বা ছুরিকাঘাতের মত যন্ত্রণা অনুভব করিয়ে থাকে। প্রচন্ড ঠান্ডায় বা প্রচন্ড গরমের সময় এই ব্যথা তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। এই রোগটি প্রথম দিকে সংক্ষিপ্ত এবং হালকা ব্যথা দ্বারা শুরু হয়। পরে ব্যথা ঘনঘন, তীব্র, দীর্ঘ এবং খারাপের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
সাধারণত এই ব্যথা একতরফা হয় এবং কিছু চিবানো, হালকাভাবে মুখ স্পর্শ করা, শেভ করা এমনকি হাসির মত দৈন্দন্দিন কাজগুলো করার মাধ্যমেও ট্রিগার হতে বলা হয়। এই রোগটিকে আবার সুইসাইড ডিজিজ বা আত্মহত্যা রোগও বলা হয়। যার কারণ এই রোগে আক্রান্ত বেশিরভাগ ভুক্তভোগী রোগের চিকিৎসা না পেয়ে এবং তীব্র ব্যথার তীব্রতায় আত্মহত্যা করেছে বলে জানা যায়। তবে এই দাবি যে সম্পূর্ণ সঠিক এইটাও বলা যায় না। কারণ এর যথেষ্ট প্রমাণ নেই। ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার সাথে যুক্ত ব্যথাকে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার সবচেয়ে বিরক্তিকর রুপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘস্থায়ী এই রুপে ব্যথা অল্প হতে পারে। কিন্তু এই ব্যথা রোগীকে বিরক্তির মধ্যে রাখে সব সময়। মূলত চিকিৎসকগণ সহজে এই রোগটি নির্ণয় করতে পারে না বলেই রোগীকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়ে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় রোগীর দাঁতের ব্যথা কমাতে অনেক ডেন্টিস্ট রোগীর একাধিক দাঁত উঠিয়ে ফেলেন৷ কিন্তু, রোগীর ব্যথা কমার কোনো নামই থাকে না। আবার অনেকে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞর স্মরণাপন্ন হয়। অনেক চিকিৎসা নেওয়ার পরেও কোনো উপকার হয় না।
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার কারণঃ
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া মূলত বর্ধিত রক্তনালী দ্বারা সৃষ্টি হয়৷ যা ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুর কম্পন বা সংকোচন সৃষ্টি করে। এই সংকোচন সাধারণত প্রতিরক্ষামূলক মায়েলিন খাপের ক্ষতি করে, এবং স্নায়ুর অনিয়মিত কার্যক্রম এবং হাইপারফাংশন ঘটায়। ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া হওয়ার জন্য দায়ী হতে পারে-
★ স্ট্রোক,
★ মস্তিষ্কের ক্ষত বা সিপি কোণে অস্বাভাবিকতা,
★ হার্পিস জোস্টার
★ একাধিক স্খলন,
★ নিদারুণ পরাজয়,
★ Scleroderma
★ ট্রমা- দূর্ঘটনায় আঘাত, অস্ত্রোপাচারের আঘাত, মুখের আঘাত ইত্যাদি।
যাদের ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার ঝুঁকি বেশিঃ
এই রোগটিতে আক্রান্ত হওয়ার কিছু কারণ রয়েছে। আবার কিছু মানুষের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। যাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে-
* উচ্চ রক্তচাপের রোগী,
* এডেনোকারসিনোমায় আক্রান্ত ব্যক্তি,
* হার্পিস জোস্টারে আক্রান্ত ব্যক্তি, পুরুষের তুলনায় নারীরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়।
* সাধারনত ৫০ বছরের বেশি এমন মানুষের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তবে ৫০ এর কম বয়সী রোগীও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
* দূর্ঘটনায় মাথায় এবং মুখে আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তি। এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার লক্ষণঃ
অধিকাংশ রোগেরই কিছু লক্ষণ রোগীর মাঝে দেখা যায়। ঠিক এই রোগেরও বেশ কিছু লক্ষণ রয়েছে। এই লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১. গাল, মাড়ি, দাঁত, চোয়াল, ঠোঁট, চোখ বা কপালে ব্যথা।
২. তীব্র “ছুরিকাঘাত, গুলি, ধাক্কার মত” ব্যথা অনুভব হওয়া।
৩. ব্যথা স্বল্প সময় হতে পারে আবার কয়েক মিনিট স্থায়ী হতে পারে।
৪. ব্যথা প্রতিদিন বা সপ্তাহে বেশ কয়েকবার হতে পারে। আবার কিছুক্ষণের জন্য ব্যথা নাও থাকতে পারে।
৫. কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ব্যথামুক্ত পিরিয়ডের সময় ব্যথা শুরু হতে পারে।
৬. ঘুমের সময় রোগী ব্যথা অনুভব করবে না। জেগে থাকলে ব্যথা হবে।
ক্লাসিক ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া হঠাৎ তীব্র ব্যথার মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়। যদি ব্যথা কম তীব্র হয় কিন্তু ক্রমাগত ব্যথা বা জ্বলন্ত সংবেদনের মতো হয়, তবে ধরে নেওয়া হয় এই ব্যথা অ্যাটিপিকাল টার্মিনাল নিউরালজিয়ার করণে হয়।
নির্ণয় পদ্ধতিঃ
অনেক কারণেই মুখে ব্যথা হতে পারে। যার কারণে অধিকাংশ সময়েই মাইগ্রেন, পোস্ট-হার্পেটিক নিউরালেজিয়া, টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্ট ডিসঅর্ডার, ক্লাস্টার মাথাব্যথার সাথে ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়াকে গুলিয়ে ফেলা হয়।
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া নিশ্চিত করার জন্য একজন নিউরোলজিস্ট মুখের ব্যথার ধরণ, অবস্থান এবং ট্রিগারের উপর ভিত্তি করে কিছু টেস্ট করার পরামর্শ প্রদান করে। নিউরোভাসকুলার দ্বন্দ্ব, মাল্টিপল স্কেলেরোসিস বা এক ধরণের টিউমার যা ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া সৃষ্টি করে, তা আছে কিনা নিশ্চিত হতে ডাক্তার MRI এর সাথে রিফ্লেক্স টেস্ট এবং স্নায়ুবিক পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি নির্ণয় করে থাকেন।
কখন ডাক্তার দেখাতে হবেঃ
যখন ওভার দ্যা কাউন্টার পেইন কিলার সেবন করার পরেও ব্যথা কমে না বা যখন তীব্র ব্যথার কারণে রোগীর অবস্থা অসহনীয় অবস্থায় পৌঁছায় তখন ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হতে হবে। আবার ব্যথার পুনরাবৃত্তি হলেও ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হতে হবে।
মুখের ব্যথার ট্রিগার, ব্যথার তীব্রতা এবং কত ঘনঘন ব্যথা আক্রমণ করছে এবং এই ব্যথা কতক্ষণ স্থায়ী হয় এই বিষয়গুলো ডাক্তারকে অবশ্যই বলতে হবে। এগুলো না বললে চিকিৎসক দ্রুত রোগীকে চিকিৎসা দিতে সক্ষম হবে না। বা ব্যথা যে ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার জন্য হচ্ছে এই বিষয়ে অনুমান করতে পারবেন না।
চিকিৎসাঃ
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা শুরু হয় ঔষধ সেবনের পরামর্শ দিয়ে। এই ঔষধগুলোর মধ্যে ব্যথানাশক ঔষধ, যা ব্যথাকে মস্তিষ্কে যেতে বাঁধা প্রদান করে। পাশাপাশি এন্টিকনভালসেন্ট এবং নিউরোভাসকুলার দ্বন্দ্বের প্রভাব কমাতে পেশী শিথিলকারী ঔষধ সেবনের নির্দেশ দিতে পারেন চিকিৎসক। রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগ কমানোর জন্যও ঔষধ সেবনের নির্দেষণা প্রমাণ করতে পারেন চিকিৎসক।
সাধারণত, ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া প্রগতিশীল এবং ঔষধের প্রতিক্রিয়াশীল হতে পারে না। কখনো কখনো ঔষধে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তখন ডাক্তার ঔষধ সেবন বন্ধ করার নির্দেশ করেন। এসকল ক্ষেত্রে ডাক্তারগণ অস্ত্রোপাচার অথবা বিকল্প কিছু আক্রামণাত্মক চিকিৎসার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এসকল চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে-
১. রেডিওফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন,
২. মাইক্রোভাসকুলার ডিকম্প্রেশন এবং
৩. স্টেরিওটাসিক রেডিওসার্জারি।
রেডিওকম্পাঙ্ক অপসারণঃ
রেডিওফ্রিকোয়েন্সি (RF) অ্যাবলেশন একটি ন্যূনতম আক্রমণাত্মক, নিরাপদ এবং কার্যকর পদ্ধতি। যা ড্রাগ প্রতিরোধী ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। এই পদ্ধতির রেজাল্ট মাইক্রোভাসকুলার ডিকম্প্রেশন পদ্ধতির সাথে তুলনীয়। RF অ্যাবলেশন বর্তমানে এই রোগের চিকিৎসায় পছন্দের পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে এনেস্থেসিয়ার প্রভাবে হাই রিস্কে আছে এবং বয়স্ক রোগীদের জন্য এই পদ্ধতিটি বেশ নিরাপদ। এই পদ্ধতিতে বেছে বেছে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি ইলেক্ট্রিক সংকেত ব্যবহার করে ব্যথার সাথে যুক্ত নার্ভ ফাইবারগুলোকে ধ্বংস করে দেয়।
এই চিকিৎসায় একজন নিউরোসার্জন রোগীকে ঘুমের ঔষধ প্রয়োগ করে অচেতন করেন। অত:পর ট্রাইজেমিনাল নার্ভে একটি ফাঁপা সুঁই প্রবেশ করান এবং সুঁইটি গাইড করেন। গাইড করা শেষে রোগীকে অচেতন অবস্থা থেকে জাগ্রত করেন। অত:পর একটি ইলেক্ট্রোড সুঁইয়ের মাধ্যমস পাস করা হয়। এবং ব্যথার অবস্থান নিশ্চিত করতে একটি হালকা সংকেত প্রয়োগ করা হয়।
টার্গেট নার্ভ ফাইবার নিশ্চিত হয়ে গেলে রোগীকে পুনরায় রেডিওফ্রিকোয়েন্সি থার্মাল ক্ষতের জন্য অজ্ঞান করা হয়। অত:পর নিউরোসার্জন বাছাই করে ইলেক্ট্রোড গরম করে নার্ভ ফাইবারকে উত্তপ্ত করেন। যতক্ষণ পর্যন্ত নার্ভ ফাইবার ধ্বংস না হয়ে যায় ততক্ষণ পর্যন্ত ডাক্তার এই প্রসেসটি চালাতেই থাকে। এর ফলে নার্ভের এলাকায় কিছুটা ক্ষত সৃষ্টি হয়। এই প্রসেস শেষ হওয়ার পরে কয়েক ঘন্টার জন্য রোগী মুখে অসাড়তা অনুভব করতে পারে। এবং হালকা ব্যথা অনুভব করতে পারে।
মাইক্রোভাসকুলার ডিকম্প্রেশনঃ
মাইক্রোভাসকুলার ডিকম্প্রেশনের মধ্যে রক্তনালীসগুলোর বিচ্ছিন্নতা জড়িত। যা ট্রাইজেমিনাল নার্ভকে সংকুচিত করে থাকে। ডাক্তার আক্রান্ত রক্তনালীটি স্থানান্তরিত করেন অথবা প্রভাবিত ট্রাইজেমিনাল নার্ভের সংস্পর্শ থেকে অন্য নার্ভগুলোকে সরিরে ফেলেন।
এক্ষেত্রে নিউরোসার্জন রোগীর মুখের যে পাশে ব্যথা সেই পাশের কানের পিছনে একটু কেটে ফেলেন। তারপর খুলিতে ছোট একটি গর্ত তৈরি করে ধমনীগুলোকে ট্রাইজেমিনাল নার্ভ বরাবর সরিয়ে দেয়। এবং স্নায়ু ও ধমনীর মধ্যবর্তী স্থানকে কুশন করে।
মাইক্রোভাসকুলার ডিকম্প্রেশনের অধিকাংশ সময়ে সফলতা পাওয়া যায়। তবে কিছুক্ষেত্রে ব্যথা পুনরাবৃত্তি হতে পারে। এই পদ্ধতিতে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশনের মতো রোগীদের মুখ অসাড় হয়ে যাওয়া অনুভব করতে হয় না। তবে এক্ষেত্রে শ্রবণশক্তি হ্রাস, দুর্বলতা, অন্যান্য জটিলতা এমনকি স্ট্রোকের মত ভয়াবহতার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্টেরিওট্যাকটিক রেডিওসার্জারিঃ
স্টেরিওট্যাকটিক রেডিওসার্জারি হচ্ছে এক ধরণের অ-আক্রমণকারী রেডিওথেরাপি। এই পদ্ধতিরও সফলতার হার অনেক ভালো। এই ধরণের চিকিৎসায় একজন নিউরোসার্জন টারফগেট ট্রাইজেমিনাল নার্ভ ফাইবারকে ক্ষতিগ্রস্থ করার জন্য বিকিরণের ফোকাসড বিম ব্যবহার করেন৷ স্টেরিওট্যাকটিক রেডিওসার্জারী করার কয়েক সপ্তাহ পরে ধীরে ধীরে ব্যথা কমতে থাকে। যদি পুনরায় ব্যথা অনুভূত হয়, তাহলে চিকিৎসক রোগীকে পুনরায় স্টেরিওট্যাকটিক রেডিওসার্জারী দেওয়া শুরু করবেন।
আরও পড়ুনঃ পালমোনারি ফাইব্রোসিস কি?