পেমফিগাস ভালগারিস
পেমফিগাস ভালগারিস হচ্ছে একটি বিরল অটোইমিউন রোগ। যা ত্বকে দীর্ঘস্থায়ী ফোস্কা ও ঘা সৃষ্টি করে। পেমফিগাসের একটি ধরন হচ্ছে এই পেমফিগাস ভালগারিস। যা পেমফিগাসের সবচেয়ে সাধারণ রুপ।
অতি সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া হিসেবে পেমফিগাস ভালগারিসকে শ্রেনীবদ্ধ করা হয়। মূলত ডেসমোসোমের বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি করে এই রোগটি। ডেসমোসোম ত্বকের উপাদান যা ত্বকের নির্দিষ্ট স্তরগুলোকে একে অপরের সাথে আবদ্ধ রাখতে কাজ করে। এই ডেসমোসোমে রোগটি আক্রমণ করার সাথে সাথে ত্বকের স্তরগুলো পৃথক হয়ে যায়৷ ফলে রোগীর দেহে ফোস্কার মত দেখা যায়।
এই ফোস্কাগুলো অ্যাক্যানথোলাইসিসি বা অটোএন্টিবডি মধ্যস্থ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আন্তঃকোষীয় সংযোগ ভেঙে যাওয়ার কারণে হয়ে থাকে। সময়ের সাথে সাথে রোগীর অবস্থা অনিবার্যভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে ফোসকাগুলো আকারে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এই ফোস্কাগুলো শারীরবৃত্তীয়ভাবে তীব্র পোড়ার মত আচরণ করে।
আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার হওয়ার আগে এই রোগে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর হার ছিল ৯০% এর আশেপাশে। আধুনিক চিকিৎসা আসার পরে বর্তমানে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে কর্টিকোস্টেরয়েড প্রবর্তনের পরে সঠিক চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ৫ থেকে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ১৯৯৮ সালে ত্বকের রোগে মৃত্যুর কারণের তালিকায় চতুর্থ স্থানে ছিল এই পেমফিগাস ভালগারিস। যার কারণে এখনও এই রোগটিকে “সম্ভাব্য মারাত্মক” রোগ বলে বিবেচনা করা হয়।
মূলত ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সী মানুষদের এই রোগে বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যায়। তবে মধ্যবয়সী এবং বয়ষ্ক মানুষও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এই রোগটিতে পুরুষের তুলনায় নারীদের বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যায়।
গবেষণাঃ
ইঁদুরের পেমফিগাস ভালগারিসের চিকিৎসার জন্য জেনেটিক্যালি মডিফাইড টি-কোষ ব্যবহার করার রিপোর্টটি ২০১৬ সালে প্রকাশ করা হয়েছিল। রিটুক্সিমাব নির্বিচারে সকল বি-কোষকে আক্রমণ করে। যা শরীরের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা করে।
পরীক্ষামূলক চিকিৎসায় মানব টি-কোষগুলোকে জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ার করা হয়। যেন সেই বি-কোষগুলোকে সহজে চিনতে পারা যায়। যা ডেসমোগ্লিনের জন্য এন্টিবডি তৈরি করে।
পিভিতে অটোএক্টিভ বি-কোষগুলো Dsg3 এর বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি করে। যা আঠালো কার্যকারিতা ব্যহত করার পাশাপাশি ত্বকে ফোসকা তৈরি করে। এসকল ফোস্কার পৃষ্ঠে Dsg3 প্রকাশ করে CAAR-T কোষগুলো সেই বি-কোষগুলোকে প্রলুব্ধ করে। এবং সেই কোষগুলো মেরে ফেলে৷ যার ফলে সেই সময় গবেষকগণ রিপোর্টে বলেছিল Dsg3 CAAR-T কোষগুলো ল্যাব ডিশে এবং ইঁদুরের মধ্যে Dsg3 নির্দিষ্ট কোষগুলোকে মেরে ফেলে
লক্ষণ ও উপসর্গঃ
পেমফিগাস ভালগারিসের প্রথম লক্ষণ হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তির মুখে ফোস্কা দেখা যায় (বিশেষ করে বুকাল ও প্যালাটিন মিউকোসা)। এর পাশাপাশি ত্বকেও ফোস্কা পড়তে দেখা যায়৷ অন্যান্য মিউকোসাল পৃষ্ঠ যেমন, কানজাংটিভা, খাদ্যনালি, লিঙ্গ/যৌনাঙ্গ, যোনি, জরায়ু, মলদ্বার, ভালভা এবং নাক আক্রান্ত হতে পারে। রোগীর ত্বকের উপর ফ্ল্যাকসিভ ফোস্কা প্রায়শই দেখা যায়। এছাড়াও হাতের তালু এবং তলপেট ঢেকে অবশিষ্টাংশ পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। এই ফোস্কাগুলো সাধারণত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়৷ এবং ক্ষত থেকে ক্ষয় সৃষ্টি করে। একটি ইতিবাচক নিকোলস্কি চিহ্ন (স্বাভাবিক ত্বকে বা ফোস্কার প্রান্তে ফোস্কার উপস্থিতি) পেমফিগাস ভালগারিসের ইঙ্গিত দেয়। এসময় খাবার চিবানোর সময় তীব্র ব্যথা, ওজন কমে যাওয়া এবং অপুষ্টিজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
প্যাথোফিজিওলজি:
পূর্বেই বলা হয়েছে পেমফিগাস হচ্ছে একটি অটোইমিউন রোগ, যা ডেসমোসোমে উপস্থিত ডেসমোগ্লিন 1 এবং ডেসমোগ্লিন 3 উভয়ের কাজ করে এমন এন্টিবডি দ্বারা সৃষ্ট। ডেসমোজোম কমে যাওয়ার কারণে এপিডার্মিসে কেরাটিনোসাইট সমূহের মধ্যে সংহতি নষ্ট হয়ে যায়। এবং অক্ষত ত্বক দ্বারা পরিবেশিত ফাংশনে বাঁধা প্রদান করে। এই প্রক্রিয়াটিকে টাইপ 2 হাইপারস্পেনসিটিভিটি হিসেবে শ্রেনীবদ্ধ করা হয়। এখানে মূলত এন্টিবডিগুলো শরীরের নিজস্ব টিস্যুতে এন্টিজেনের সাথে আবদ্ধ হয়ে থাকে।
হিস্টোলজিতে বেসাল কেরাটিনোসাইটগুলো সাধারণত বেসমেন্ট মেমব্রেনের সাথে সংযুক্ত থাকে। যা “টম্বস্টোনিং” নামক একটি বৈশিষ্টযুক্ত চেহারা তৈরি করে।
কেরাটিনোসাইট এবং বেসাল স্তরের মধ্যে ট্রান্সুডেটিভ সুপ্রাবাসাল স্প্লিট নামক এক ধরণের তরল জমা হয়। এই তরল মূলত একটি ফোস্কা তৈরি করে৷ এই ফোস্কায় পার্শ্বীয় বল প্রয়োগ করলে সহজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যার ফলে একটি পজেটিভ নিকোলস্কির চিহ্ন হিসেবে পরিচিত। এটি বুলাস পেমফিগয়েডের একটি বিপরীত বৈশিষ্ট। যা এন্টিহেমিডেসমোসোম এন্টিবডিগুলোর কারণে হয় বলে মনে করা হয়। যার প্রভাবে সেখানে এপিডার্মিস এবং ডার্মিসের (সাবপিডার্মাল বুলে) মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ঘটে।
ক্লিনিক্যালি পেমফিগাস ভালগারিস ব্যাপকভাবে ঝিমঝিম ফোস্কা এবং শ্লেষ্মা ঝিল্লির ক্ষয় এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়।
পেমফিগাস ভালগারিসের তীব্রতার সাথে মিউকোসাল ক্ষত, ডেসমোগ্লিন 3 এর মাত্রার সাথে সরাসরি সমানুপাতিক বলে মনে করা হয়। পেমফিগাসের হালকা রুপ যেমন ফোলিয়াসিয়াস এবং এরিথেমাটোসে ডেসমোগ্লিন 1 এর বিরুদ্ধে বেশি শক্তিশালী।
পেমফিগাস ভালগারিসে প্রায়শই মধ্যবয়সী এবং বয়স্ক রোগীদের আক্রান্ত হতে দেখা যায়। ৫০ থেকে ৬৫ বছর বয়সী মানুষ সবচেয়ে বেশি রোগী আক্রান্ত হয়। সাধারণত ফোস্কা দিয়ে রোগটি শুরু হয়। এবং ফোসকাটা খুব সহজেই ফেটে যায়। ফোস্কাটি শুধু শরীরেই হবে এমনটি নয়, ফোস্কাটি মুখেও উঠতে পারে। ফোস্কার ক্ষতগুলো বেশ গভীর ও বিস্তৃত হতে পারে।
রোগ নির্ণয়ঃ
যেহেতু পেমফিগাস ভালগারিস বিরল একটি রোগ, তাই রোগটি নির্ণয় করা প্রায়শই জটিল এবং দীর্ঘ সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক রোগ মনে করে চিকিৎসা নেওয়া বা সঠিক সময়ে ডাক্তারের কাছে না যাওয়াটা রোগ নির্ণয়ে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। রোগটির প্রাথমিক পর্যায়ে মুখে ক্ষয় বা ত্বকে ফোসকা উঠে থাকে। এই ফোস্কাগুলো অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং চুলকানিযুক্ত হতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে ফোসকাগুলোতে একটি পজেটিভ নিকলস্কির লক্ষণ দেখা যেতে পারে। যেখানে সামান্য ঘষা লাগার ফলে ত্বক ঝুলে পড়বে। তবে এই জিনিসটা সবসময় দেখা যাবে এমনটাও না।
রোগটি নির্ণয়ের জন্য আদর্শ মান হচ্ছে ক্ষতের চারপাশের অঞ্চল থেকে একটি পাঞ্চ বায়োপসি বা সরাসরি ইমিউনোফ্লোরেসেন্ট স্টেইনিং দ্বারা পরীক্ষা করা। এর মাধ্যমে কোষগুলো অ্যাক্যানথোলাইটিক অর্থাৎ স্বাভাবিক আন্তঃকোষীয় সংযোগের অভাব যা তাদের একসাথে ধরে রাখে৷ এগুলো একটি Tzanck স্মিয়ারেও দেখা যায়। এই কোষগুলো মূলত গোলাকার, নিউক্লিয়েটেড কেরোটিনোসাইট। যা কোষের আঠালো প্রোটিন ডেসমোগ্লিনের এন্টিবডি-মধ্যস্থতার ক্ষতির কারণে তৈরি হয়।
পেমফিগাস ভালগারিসকে সহজেই ইমপটিগো এবং ক্যান্ডিডিয়াসিসের সাথে গুলিয়ে ফেলা যায়৷ IgG4 কে রোগজীবাণু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অবস্থার কারণে হওয়া সংক্রামণের পরীক্ষা করে এবং এন্টিবায়োটিক চিকিৎসায় সাড় না পাওয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
চিকিৎসাঃ
পেমফিগাসের লক্ষণ কমাতে কর্টিকোস্টেরয়েড এবং অন্যান্য ইমিউনোসপ্রেসিভ ঔষধ ঐতিহাসিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে৷ তবুও স্টেরয়েডগুলো গুরুত্বর এবং দীর্ঘস্থায়ী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করায় এই ঔষধগুলোর প্রয়োগ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা জরুরী। ইন্ট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লুবিন, মাইকোফেনোলেট মোফেটিল, এজাথিওপ্রিন, সাইক্লোফসফামাইড এবং মেথোটেক্সেট জাতীয় ঔষধও রোগীর অবস্থাভেদে বিভিন্ন মাত্রায় ব্যবহার করে সফলতা পাওয়া গেছে।
স্টেরয়েডের একটি পরীক্ষিত বিকল্প হচ্ছে মনোক্লোনাল এন্টিবডি যা ক্রমবর্ধমানভাবে প্রথম সারির চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই ঔষধের মধ্যে অন্যতম রিটুক্সিমাব। ২০১৮ সালের গ্রীষ্মে FDA একটি গবেষণায় দ্রুত সফলতা পাওয়ার পরে রিটুক্সিমাবকে পূর্ণ অনুমোদন দেয়। অসংখ্য কেস সিরিজে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা রিটুক্সিমাবের এক রাউন্ড পরেই রিমুভ বা পজেটিভ রেসপন্স করা শুরু করে। রোগের শুরুতে এমনকি রোগ নির্ণয় করার সাথে সাথে যদি চিকিৎসা শুরু করা যায় তাহলে চিকিৎসার সফলতা এবং রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
১১ জন রোগীর উপর গবেষণা করে দেখা যায় ১০ জন রোগীর ক্ষেত্রে মাসিক IV ইমিউনোগ্লোবুলিন ইনফিউশনের সাথে রিটুক্সিমাব চিকিৎসার ফলে দীর্ঘমেয়াদি ফোস্কা ও ঘা ভালো হয়েছে এবং চিকিৎসা বন্ধ বা শেষ হওয়ার পরেও ১০ বছর রোগীর শরীরে রোগের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা যায়নি।
রোগটি পরিচালনায় এন্টি-CD20 মনোক্লোনাল চিকিৎসা রিটুক্সিমাবের সফল ব্যবহারের কারণে অন্যান্য এন্টি-CD20 ঔষধসমূহ যেমন- Veltuzumba, ocrelizumb এবং Ofatumumab সম্ভাব্য চিকিৎসা হিসেবে গবেষণা করা হয়েছে। পেমফিগাস ভালগারিস থেরাপিউটিকসের প্রধান কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রিন্সিপিয়া বায়োফার্মা, টোপাস থেরাপিউটিকস এবং অক্সিজেন বিভিবিএ।
এই রোগের তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিকাল ট্রায়ালে রিটুক্সিমাব মাইকোফেনোলেট মফেটিলের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকার ফল দিয়েছে।
পেমফিগাস ভালগারিস রোগটি সাধারণত ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তির শরীরে বিকাশ ঘটে না। আর এই রোগটি সংক্রামক নয়। যার ফলে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে রোগ ছড়িয়ে পড়বে এমন সম্ভাবনা নেই।
এই রোগটিতে অন্যান্য গোষ্ঠির তুলনায় ইহুদিদের আক্রান্ত হওয়ার হাড় ৪০ শতাংশ বেশি। ২০১২ সালে ইসরায়েলের কিছু গবেষক এই গবেষণার রিপোর্ট প্রকাশ করেছিলো। পাশাপাশি একটি জেনেটিক কারণকে এই রোগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
কিছু তথ্য অনুযায়ী জানা যায় এই বিরল রোগটিতে পুরুষের তুলনায় মহিলাদের আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। আবার কিছু গবেষণায় বলা হয় নারী-পুরুষ উভয়ের আক্রান্ত হওয়ার হার সমান।